২০২১ সাল নাগাদ পোশাক রফতানি থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। দেশের পোশাক শিল্পের জন্য এটা বড় উল্লম্ফন। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রফতানি আয়ের এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। একই মতামত এ খাতের ব্যবসায়ীদেরও। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২১ সাল নাগাদ পোশাক রফতানি থেকে আয় হতে পারে ৩৮ বিলিয়ন ডলার।

পোশাক রফতানি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের মাইলফলক অর্জনে মূল বাজারগুলোর পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরি ও অপ্রচলিত বাজারগুলোয় অবস্থান আরো শক্তিশালী করার কথা ছিল। কিন্তু রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে বিদ্যমান বড় বাজারগুলোয় রফতানি লক্ষ্য অনুযায়ী ভালো হয়নি। আবার নতুন বাজারগুলোর মধ্যে দেশভেদে রফতানি কিছুটা বাড়লেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ছিল না। সব মিলিয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনে পোশাক রফতানিতে প্রতি বছর দুই অংকের বেশি প্রবৃদ্ধির কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। এসব বিবেচনায় কমিয়ে আনা হয়েছে ২০২১ সাল নাগাদ পোশাক রফতানি থেকে আয়ের প্রক্ষেপণ।

তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন, রফতানি বৃদ্ধিসহ বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বস্ত্র খাত সম্পর্কিত অংশীজনদের সঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে গত ২৬ ডিসেম্বর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পোশাক খাতে রফতানি বৃদ্ধি কার্যক্রম শীর্ষক পর্যালোচনায় ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বহির্মুখী ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষণে বলা হয়, বর্তমান গতিতে এগোলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোশাক রফতানি থেকে ৩২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যের বিপরীতে অর্জিত হবে ৩২ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে এ প্রাক্কলন করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৪ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যের বিপরীতে অর্জন হবে ৩৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যের বিপরীতে অর্জন হবে ৩৮ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে পোশাক রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার পিছিয়ে থাকবে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মিজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, পোশাক রফতানি আয়ের লক্ষ্য অর্জনে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার করণীয় নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। এছাড়া আলোচনা হয়েছে অবকাঠামো ও অন্যান্য দুর্বলতা মোকাবেলার বিষয়ে। কারণ বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বস্ত্রসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

পোশাক পণ্যের বাজার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি পণ্যে বৈচিত্র্য না থাকাও লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইপিবির পরিসংখ্যানেও রফতানি খাতের বৈচিত্র্যহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, মোট পোশাক রফতানির ৮০ শতাংশই এখনো টি-শার্ট, ট্রাউজার, শার্ট, জ্যাকেট ও সোয়েটার। পণ্যের পাশাপাশি রফতানি বাজারও এখন পর্যন্ত সীমিত। মোট রফতানির ৭০ শতাংশই হয় ১০টি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও চীনে।

এসব বিবেচনায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রক্ষেপণকে সঠিকই বলছেন পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা। তাদের দাবি, পোশাকের রফতানি বাজারে চাহিদায় গত কয়েক বছর মন্দা বিরাজ করেছে। পাশাপাশি ছিল পোশাক কারখানা মূল্যায়ন পরবর্তী সংশোধন কার্যক্রম। এ দুই কারণে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন না হওয়ার বিষয়টি এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শুধু পোশাক খাত থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব হবে না। কারখানার সংশোধন কার্যক্রম এর অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক সংস্থার তদারকিতে মূল্যায়ন পরবর্তী সুফল আমরা মাত্র পেতে শুরু করেছি। সংশোধন কার্যক্রমের কারণে গত কয়েক বছরে আয়ের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ছিল না। এ সুযোগ গ্রহণ করেছে প্রতিবেশী দেশগুলো। ফলে বর্তমানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ঘাটতিও তৈরি হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক চাহিদায় গত কয়েক বছরে মন্দা বিরাজ করেছে।

পোশাক পণ্যের রফতানি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের চেয়ে প্রতিযোগীদের এগিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে। তাতে দেখা যায়, ২০০০ সালে বৈশ্বিক রফতানির ২ দশমিক ৬ শতাংশ করেছিল বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৫ শতাংশে। তবে ২০১০ সালে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ৪ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বৈশ্বিক রফতানির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলাদেশের। যদিও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে বৈশ্বিক রফতানিতে নিজেদের অংশ বাড়াচ্ছে ভিয়েতনাম। ২০০০ সালে বৈশ্বিক রফতানির দশমিক ৯ শতাংশ ছিল ভিয়েতনামের। ২০০৫ সালে এ অংশ বেড়ে হয় ১ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১০ সালে হয় ২ দশমিক ৯ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বৈশ্বিক রফতানির ৫ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে ভিয়েতনাম থেকে। একক দেশ হিসেবে ২৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর ২৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানির মাধ্যমে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম।

বাংলাদেশী পোশাকের প্রধান গন্তব্যগুলোয়ও রফতানি সেভাবে বাড়ছে না। বাংলাদেশী পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তিন অর্থবছর ধরে রফতানি আয়ে পতন দেখা গেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫৬২ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, ৫২০ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার এবং ৫৩৫ কোটি ২০ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ইউরোপের বাজার থেকে আয় বাড়লেও তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ইউরোপের বাজারে পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৭১৫ কোটি, ১ হাজার ৭৭৫ কোটি ও ১ হাজার ৯৬২ কোটি ডলার।

শুধু পোশাক থেকে না হলেও প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ এবং হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল খাতের রফতানি আয় হিসাবে নিলে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে বলে মনে করছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।

২০২০-২১ অর্থবছর শেষে এ খাতগুলো থেকে রফতানি আয় প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ১২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পোশাক পণ্যের ১১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দূর হবে প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ এবং হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল পণ্যের সম্মিলিত আয়ের মাধ্যমে। তৈরি পোশাক, প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ এবং হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল পণ্যের সমন্বিত রফতানি আয়ের পরিমাণ হবে ৫১ দশমিক শূন্য ১৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে তৈরি পোশাক থেকে লক্ষ্য অনুযায়ী রফতানি আয় পেতে বেশ কিছু উপায়ও বাতলেছে মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা এবং নীতি প্রণয়নসহ বৈচিত্র্যময়তা এবং জাপান, চীন, ব্রাজিল, আফ্রিকা, রাশিয়া ও সিআইএসের মতো সম্ভাব্য বাজার অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছে তারা। স্যুট, উইমেন ওয়্যার, ইন্টিমেট ওয়্যার, সুইম ওয়্যার ও স্পোর্টসওয়্যারের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরি ও রফতানির কথা বলেছে মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের মধ্যে আরো আছে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা অর্জনে কার্যক্রম গ্রহণ। রফতানি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ ও মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি বস্ত্র খাতে চাহিদাভিত্তিক দক্ষ জনবল তৈরির কথা বলা হয়েছে।

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ