বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে ২৫ দিন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

 

২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন কারণে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখায় এ ক্ষতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার গত বছর ১৮ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইন্টারনেট ভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন: ফেসবুক, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহার প্রায় ২২ দিন বন্ধ রাখে।

এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার মাত্র তিন দিন পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে আরো তিনটি একইরকম প্ল্যাটফর্ম টুইটার, স্কাইপে ও ইমোর ব্যবহারে তিন দিন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্ল্যাক আউটে মোট ৬ কোটি ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৩০৯ ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। যার অর্থ ওই সময়ে ইন্টারনেট বন্ধের কারণে প্রতিদিনের ক্ষতি ছিল প্রায় ২৭ লাখ ডলার।

এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পর্যবেক্ষণ একটি অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে ইন্টারনেটের গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। তাছাড়া সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখলেও তাতে খুব একটা কাজ হয়েছে বলে মনে করেন না তারা।

বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার ফেসবুক পেজ আছে যেগুলো অনলাইন ব্যবসায় ব্যবহার হয়ে থাকে। এই পেজগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ থাকলে এসব ছোট উদ্যোগ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্ল্যাকআউটে মোবাইল অপারেটরদের প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ইন্টারনেট ডাটা বিক্রি থেকে আসা রাজস্ব কমেছে ৩০ শতাংশ।

একই সময়ে বাংলাদেশে টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোবাইলে ইন্টরনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ২৩ লাখ থেকে কমে ৮ লাখ ৬৩ হাজারে দাঁড়ায়।

এছাড়া চলতি বছরের আগস্টে বিটিআরসি জরুরি অবস্থা মোকাবিলার রিহার্স্যাল হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে সাময়িক সময়ের জন্য পরীক্ষমূলকভাবে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সংযোগ বন্ধ করে দেয়। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি চলমান প্রক্রিয়া, ভবিষ্যতে আরো হতে পারে।

গবেষণাটিতে আরো বলা হয়, ইন্টারনেট বন্ধে বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে এক বছরে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৪০ কোটি ডলার অপচয় হয়েছে।

১৯টি দেশে পরিচালিত ব্রুকিংসের গবেষণায় দেখা যায়, সম্পূর্ণ বা আংশিক ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ভারতের। দেশটিতে ২০১৫-১৬ সালে জিডিপির হিসাবে ৯৬ কোটি ৮ লাখ ৮ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে।

এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তানে ইন্টারনেট বিধিনিষেধের কারণে প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ ৬ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের চেয়ে কিছু বেশি।

ব্রুকিংসের মতে, ইন্টারনেট বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণকারী বেশিরভাগ দেশই উন্নয়নশীল বিশ্বের। তবে উন্নত অর্থনীতিতে যদি এরকমভাবে ইন্টারনেট বন্ধ হয় তাহলে সেক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতি হবে ভয়াবহ।

ব্রকিংস উল্লেখ করেছে, তারা এই গবেষণায় ডিজিটাল অ্যাকসেস, কর্মীদের উৎপাদন দক্ষতায় প্রভাব, বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি, ইন্টারনেট বন্ধের কারণ ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা, ক্রেতা ও ব্যবসায়িক নির্ভরযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো এই ক্ষতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেনি। ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বাড়তে পারে।

প্রসঙ্গত, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট হলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক। বিশ্বব্যাপী সাইবার নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেন তারা।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার