ব্যাংকের তরল সম্পদের প্রায় তিন-চতুথাংশই সরকারের কোষাগারে আটকে আছে। মোট দুই লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা তরল সম্পদের মধ্যে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকাই বিল ও বন্ড আকারে সরকারের কোষাগারে রয়েছে। ব্যাংকারেরা জানিয়েছেন, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ নেয়ায় সরকারের কোষাগারে বেশি পরিমাণ অর্থ আটকে যাচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের ঋণ পরিচর্চা অর্থাৎ সুদব্যয়সহ জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৮-৯ বছর আগেও ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেশি নিত। বলা চলে বেশির ভাগ ঋণই নেয়া হতো স্বল্পমেয়াদে, অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ের জন্য। ২৮ দিন, ৬৪ দিন, ২৮০ দিন ও তিন হাজার ৩৬৪ দিন মেয়াদের জন্য সরকার বেশি হারে ঋণ নিত। কিন্তু সরকারের এ ঋণ নেয়ার ধরন পাল্টায় ২০০৯ সাল থেকে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আনার দোহাই দিয়ে সরকার স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিবর্তে বেশি হারে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ নিতে থাকে। অর্থাৎ আগে যেখানে স্বল্পসময়ের জন্য ঋণ নেয়া হতো, সে খানে তখন এ নীতি পরিবর্তন করে সরকার ৫ বছর, ১০ বছর , ১৫ বছর ও ২০ বছর মেয়াদি ঋণ বেশি হারে নিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ায় সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ব্যাংকের মোট তরল সম্পদ দুই লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকাই সরকারের কোষাগারে বিল ও বন্ড আকারে রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে যে ৭৯ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে, তারও বড় একটি অংশ সরকারের কোষাগারে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ হিসাব গত মে মাস পর্যন্ত।

সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেশি হারে নেয়ায় এক দিকে, ব্যাংকের তহবিল দীর্ঘমেয়াদে সরকারের কোষাগারে আটকে যাচ্ছে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অপর দিকে মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পড়ে প্রকৃত অর্থে ব্যাংকের মূলধনও ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

এ দিকে ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের পর বিনিয়োগ ভাটা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। এক সময় ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও তা বিনিয়োগ করতে না পারায় তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে আমানতের সুদহার কমিয়ে দেয়। এখন এ সুদহার কমতে কমতে ৫ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। ফলে সাধারণ আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা না রেখে সরকারের ঋণ নেয়ার অপর খাত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে থাকে। সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার বেশি হওয়ায় সাধারণ আমানতকারীরা সঞ্চয়পত্রের দিকেই বেশি ছুটতে থাকেন। এর ফলে সরকারের ঋণ পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যায়। সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের হার কমে গেছে। তবে, সামগ্রিকভাবে সরকারের ঋণ পরিচর্যা অর্থাৎ সুদ ব্যয় বেড়ে গেছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৫১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকাই বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধের জন্য, যা অনুন্নয়ন বাজেটের একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ। এবং সামগ্রিক বাজেটের ১১ দশমিক ১ শতাংশ।

বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। অথচ নীতি পরিবর্তন করলে অপেক্ষাকৃত কম সুদে ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন করা যেত। এটা অব্যাহত থাকলে সামনে সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা ও সুদ পরিশোধেই বাজেটের সমুদয় অর্থ ব্যয় করতে হবে। সঙ্কুচিত হয়ে যাবে উন্নয়ন বাজেট।

চলতি অর্থবছরে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার সামগ্রিক বাজেটের মধ্যে অনুন্নয়ন বাজেট ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এ অনুন্নয়ন বাজেটের মধ্যে শুধু ঋণের সুদ এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা ও পেনশন পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ আট হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ঋণের সুদ পরিশোধ করা হবে ৫১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা গত বছরের বাজেটে ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতি বছরই সরকার বাজেটের আকার বাড়াচ্ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী আয় বাড়াতে পাড়ছে না। এ কারণে ঋণনির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে বাজেট বাস্তবায়নে। ঋণনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে সুদ ব্যয়। যেমন, গত পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে সুদ ব্যয় বেড়েছে শতভাগের বেশি।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেটে সুদ ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। অস্বাভাবিক হারে ঋণের সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, সরকারের ভুল নীতির কারণে প্রতি বছরই ঋণের সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সরকার ইচ্ছে করলেই কম সুদে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু সে পথে সরকার হাঁটছে না। যেমন- বিদেশী ঋণের সুদ ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হারে বিদেশী ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে।

আবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও তুলনামূলকভাবে কম হারে ঋণ নিতে পারে। সরকার ইচ্ছে করলেই এখন সিঙ্গেল ডিজিটে অর্থাৎ স্বল্প সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যয় কমে যেত। কিন্তু সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে না। ঋণ নিচ্ছে ব্যাংকবহির্ভূত খাত অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের সুদ এখনো সাড়ে ১১ শতাংশ। গত অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে অনুযায়ী সরকার এ খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা।  সূত্র: নয়া দিগন্ত

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ