বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জ্বালানি খাতের সমন্বয়ের কথা থাকলেও প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও কমানো হয়েছে জ্বালানি খাতের।  ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বরাদ্দ খরচ করতে না পারার কারণে নতুন অর্থ বছরে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্প না থাকা, চলমান প্রকল্পের কাজ শেষ করতে না পারা এবং প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কমে আসতে পারতো। কিন্তু অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে আমদানি করা জ্বালানি তেল ও এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করায় বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। জ্বালানি খাতের এই দুরবস্থার কারণে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের জ্বালানি বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে এটা কমিয়ে ১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা করা হয়। অর্থাৎ জ্বালানি বিভাগ বরাদ্দের পুরো অর্থ খরচ করতে পারেনি।

এবার এ কারণে জ্বালানিতে ব্যয় বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরের (২০১৮-১৯) বাজেটে জ্বালানি খাতের জন্য ১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, জ্বালানিতে কোনও প্রজেক্ট নেই। কোনও খরচ নেই। বাজেট দেবে কেন? নতুন প্রজেক্ট বা চলমান প্রজেক্ট না থাকলে বাজেট দেওয়ার তো কোনও কারণ নেই।

তিনি বলেন, কাজ থাকলে টাকা দিতো। আমাদের নিজস্ব কোনও অনুসন্ধান নেই। কোনও পাইপলাইন না, কোনও কিছুই নেই। যে কয়টা আছে তা অবকাঠামোগত কাজের প্রজেক্ট। ফলে জ্বালানিতে বরাদ্দও নেই।

জ্বালানিতে বরাদ্দ কমানো হলেও বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দ। বিদ্যুৎ খাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। কিন্তু তারা ব্যয় করেছে ২২ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। এবার বিদ্যুতে বাজেট বরাদ্দ ২২ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ বেশি থাকার কথা। কিন্তু সেখানে জ্বালানিতেই খরচ কম হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুতে বেশি খরচ হচ্ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হলে বিদ্যুতের অতিরিক্ত খরচ কোনও কাজে আসবে না। বাজেটের এই বরাদ্দ এবং খরচের ধরন দেখেই বোঝা যায়, কোনও রকম পরিকল্পনা ছাড়াই চলছে জ্বালানি খাত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি উত্তোলন বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। জ্বালানির সংকট সমাধানে তেল আমদানি ও এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এদিকে এলএনজি আমদানির শুরুতেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এ দাম বাড়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও বাড়বে। এ কারণে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বেশি জোর দেওয়া উচিত বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

তারা বলছেন, বিদ্যুতের চেয়ে জ্বালানিতে ব্যয় বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা। জ্বালানি বিভাগের ব্যর্থতার কারণে অতি উচ্চ মূল্যের জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। একইসঙ্গে আমদানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানির দরও বাড়ানো হচ্ছে।

এব্যাপারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, জ্বালানিতে কর্মীদের দলগত কাজের মানসিকতা নেই। প্রকল্প পরিচালকরা অদক্ষ। এজন্য তারা ঠিকমতো কাজও করতে পারেন না। তাদের বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তারা এই সামান্য অর্থই শেষ করতে পারে না।

তিনি বলেন, আমরা উদ্যোগ নিয়েও কেবলমাত্র কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এবং ব্যর্থতার কারণে অনেক কাজ করতে পারেনি। একইসঙ্গে বিদ্যুতে এর বিপরীত চিত্র দৃশ্যমান বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী। বিদ্যুতে একটি চমৎকার দলগত কাজের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ