দুটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতিটি কেন্দ্র হবে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের, যা এ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প। একটি হবে পটুয়াখালীর পায়রায়, অন্যটি কক্সবাজারের মহেশখালীতে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) এই কেন্দ্রগুলো নির্মিত হবে জার্মানির অর্থায়নে। দুই প্রকল্পে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার (৪০ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ হবে।

 

জার্মান কোম্পানি সিমেন্স এজি বাংলাদেশের নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) সঙ্গে পায়রায় এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে মহেশখালীতে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করবে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান।

নসরুল হামিদ বলেন, এর আগে দেশে এত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বড় প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। কিন্তু এগুলো সর্বোচ্চ এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের। তিনি বলেন, কয়লার ক্ষেত্রে পরিবেশ একটা বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু এলএনজি হলো ক্লিন এনার্জি। এ ছাড়া এখন বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম কম। এ জন্য মাস্টারপ্ল্যানেও এলএনজিভিত্তিক প্রকল্পের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, দুই প্রকল্পের মধ্যে নর্থওয়েস্টের প্রকল্পটির কার্যক্রম বেশি এগিয়েছে। আজ মঙ্গলবার সিমেন্সের সঙ্গে প্রকল্প সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করবে এনডব্লিউপিজিসিএল। আর পিডিবির সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর বিষয়ে আলোচনা চলছে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত এমওইউ সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন নসরুল হামিদ।

জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বলেন, মহেশখালীতে একটি বিদ্যুৎ হাব হবে। এখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি এলএনজিভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। সিমেন্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার একটি প্রস্তাব এসেছে। তা যাচাই করা হচ্ছে। এর পরই সমঝোতা স্মারক সই হবে।

জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এলএনজিভিত্তিক কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপের ৭৫০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। এলএনজিভিত্তিক এ কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম চূড়ান্ত হয়েছে সাত দশমিক ৩১ সেন্ট (৫ টাকা ৮৫ পয়সা)। কেন্দ্রটি নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে নির্মাণ করা হবে।

সূত্র জানিয়েছে, সিমেন্স গত জুলাইতে ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে আট হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেয়। পরে বিদ্যুৎ বিভাগ নর্থওয়েস্ট ও পিডিবিকে এ বিষয়ে আলোচনার নির্দেশ দেয়। সিমেন্স তাদের প্রতিবেদনে প্রতি ইউনিটের দাম প্রস্তাব করেছে সাত সেন্ট (৫ টাকা ৬০ পয়সা)।

সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার ক্ষেত্রে পিডিবির চেয়ে নর্থওয়েস্ট এগিয়ে যায়। গত ১০ অক্টোবর সিমেন্স এমওইউ'র একটি খসড়া পাঠায় নর্থওয়েস্টকে। খসড়ার ওপর আলোচনার পর তা চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। আজ রোববার সিমেন্সের সঙ্গে তাদের এমওইউ সই হবে। এর পর যৌথ মূলধনি কোম্পানি গঠন করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রর অর্থায়ন, নির্মাণ- সবকিছুর দায়িত্ব বহন করবে সিমেন্স। পায়রায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা এক হাজার একর জমি থেকে নতুন কেন্দ্রের জন্য ১০০ একর জমি ছেড়ে দেওয়া হবে। এতে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা থাকছে না। প্রকল্পে নর্থওয়েস্ট ও সিমেন্সের মালিকানা থাকবে সমান সমান।

দেশের জ্বালানি সংকট সামনে রেখে সরকার এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বছর থেকেই দেশে এলএনজি আসবে। এ জন্য সমুদ্রে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের নির্মাণ কাজ চলছে। এখান থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। পাশাপাশি স্থলভাগেও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে উত্তর কুতুবদিয়া ও দক্ষিণ পায়রায় দুটি স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। ছয়টি স্থানের সম্ভাব্যতা যাচাই করে জাপানের টোকিও গ্যাস ইঞ্জিনিয়ারিং সল্যুশনস করপোরেশন নামে একটি পরামর্শক সংস্থা এই দুই স্থানকে টার্মিনালের জন্য বেশি উপযুক্ত বলে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ