বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) আওতায় সারা দেশে সমিতি রয়েছে ৭৮টি। এর মধ্যে ৬৩টি সমিতিই লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সমিতিগুলো লোকসান করেছে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা। যদিও ‘লাভ নয় লোকসান নয়’ ভিত্তিতে পরিচালনার উদ্দেশ্যে এসব সমিতি গঠন করা হয়েছে।

 

৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদ অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নের উত্তরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর সর্বশেষ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সে তথ্য বিশ্লেষণেই বিআরইবির অধিকাংশ সমিতির লোকসানে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।

লোকসানের কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করছে বিআরইবি। একই সঙ্গে বেতন-ভাতাদি ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধিকেও লোকসানের কারণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে বিআরইবি ব্যয় করত ৪ দশমিক ২৬১ টাকা, আর তা বিক্রি করত ৫ দশমিক ৯৬ টাকায়। সে সময় বিআরইবির গ্রস মার্জিন ছিল ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় গ্রস মার্জিন কমে দাঁড়ায় ১ টাকা ৫১ পয়সা।

তবে বিশ্বস্বীকৃত নকশা উপেক্ষা করে নতুন সংযোগ দেয়া, কুইক রেন্টালকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা আর দুর্নীতির কারণে সমিতিগুলো লোকসানে চলছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৭৭ সালে বিআরইবি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে সারা দেশে বিদ্যুতায়নের কার্যক্রম হাতে নেয় সংস্থাটি। এসব সমিতির আওতায় সারা দেশে ৩ দশমিক শূন্য ৪ লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে ১ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোয় এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৬০ এমভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন ৭৪২টি উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে বিআরইবির মাধ্যমে মাসিক ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিক্রি হয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় সিস্টেম লসের হার ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয় করে বিআরইবি। জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে বিআরইবি সহজ শর্তে সমিতিগুলোকে সব ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ও নগদ অর্থ ঋণ আকারে দিয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও লোকসানের ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারছে না বেশির ভাগ সমিতি। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৮টি সমিতির মোট রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৮৬১ কোটি ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৫ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয় ১৩ হাজার ৩৮০ কোটি ৭৭ লাখ ২৪ হাজার ২৫৩ টাকা। এ অর্থবছর শেষে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫১৯ কোটি ৭১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৮ টাকা।

লোকসানে থাকা সমিতির অধিকাংশই চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে। গত অর্থবছরে এ সমিতির আওতায় লোকসানের পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৩০০ টাকা। লোকসানের দিক থেকে বগুড়ার পরই রয়েছে নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ সমিতিতে লোকসানের পরিমাণ ৩৭ কোটি ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ টাকা। এছাড়া কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ৩০ কোটি, পাবনা-২ সমিতিতে ২৭ কোটি, নাটোরে ২৬ কোটি, চট্টগ্রাম-১ সমিতিতে ২৪ কোটি ও ঠাকুরগাঁওয়ে ২৬ কোটি টাকা লোকসান হয়।

তবে ঢাকাসহ এর আশপাশের ১৫টি সমিতি লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। লাভজনক অবস্থানে থাকা সমিতিগুলো হচ্ছে— ঢাকা, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, ভোলা ও লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

লোকসানের কারণ জানতে চাইলে বিআরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, বিদ্যুতের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় বেশির ভাগ সমিতিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবে যেসব সমিতি শিল্পাঞ্চল এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করছে, সেগুলো লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। যেসব সমিতি আবাসিক এলাকায় এবং সেচ প্রকল্পে বিদ্যুৎ দিচ্ছে, তাদেরই বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিআরইবি উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে বিদ্যুতের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কিছু অসৎ কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে এ লোকসান। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখবে সমিতিগুলো। কারণ সমিতিগুলো লোকসান গুনলেও বিআরইবি কিন্তু লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। সমিতির চেয়ে বোর্ডে তদারকি বেশি থাকার কারণেই এ চিত্র বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে বিআরইবির মোট আয় ৪০৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় বাদে এখন পর্যন্ত মুনাফা রয়েছে ১৮২ কোটি ৪ লাখ টাকা। এর আগের (২০১৪-১৫) অর্থবছরে বিআরইবির মোট আয় ছিল ৩৭৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৫২ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় বাদে ওই অর্থবছর উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছর প্রাক্কলিত মুনাফা ধরা হয়েছে ১৬৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। কিন্তু আওতাধীন সমিতিগুলোর চিত্রই ভিন্ন।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, বিআরইবির নকশা বিশ্বের সেরা একটি নকশা। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন তা অনুসরণ না করে মনগড়াভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে। তারা সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ বিতরণ করতে পারছে না। পাশাপাশি কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে বাঁচানোর অপচেষ্টার কারণে বিআরইবির কাছ থেকে সমিতিগুলোকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুতের দাম ও গ্রামীণ ভোক্তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় বিদ্যুৎ কিনেও সমিতিগুলো বিক্রি করতে পারছে না; যে কারণে লোকসানের ঘানি টানতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সমিতিগুলো কখনই মুনাফা করতে পারবে না।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার