আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় ৫২টি দেশের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। বড় দূরত্বে উড্ডয়নে সক্ষম উড়োজাহাজ ক্রয়ে বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে যখন চুক্তি হয়, তখনো আন্তর্জাতিক ২২টি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সে সময় পরিকল্পনা ছিল বিদ্যমান এ রুটগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অন্যান্য বড় রুটেও ফ্লাইট চালানোর। অথচ রুট তো বাড়েইনি, উল্টো কমে গেছে। বর্তমানে মাত্র ১৫টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। এর মধ্যে লম্বা দূরত্বের রুট আছে মাত্র একটি, ঢাকা-লন্ডন।

যদিও গত আট বছরে বোয়িং থেকে বিমানের কেনা যে সাতটি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হয়েছে, তার পাঁচটিই দীর্ঘ রুটের। আরো যে তিনটি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে, তা দীর্ঘ রুটে উড্ডয়নের জন্য। বহর পরিকল্পনার এ অদূরদর্শিতায় ভুগতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থাটিকে। ক্যাপাসিটি লসে পড়তে হচ্ছে বিমানকে।

লম্বা দূরত্ব পাড়ি দিতে সক্ষম আটটি উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ২০০৮ সালে চুক্তি করে বিমান। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বহরে যুক্ত হয়। গত আগস্টে যুক্ত হয়েছে একটি বোয়িং ৭৮৭ ‘ড্রিমলাইনার’। আরো একটি ড্রিমলাইনার আসছে আগামী ৩০ নভেম্বর। প্রতিটি উড়োজাহাজই একটানা ১৬ ঘণ্টার বেশি উড়তে সক্ষম।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, উড়োজাহাজগুলোর ক্রয়াদেশ দেয়ার সময় বিমানের আন্তর্জাতিক রুট ছিল ২২টি। কর্তৃপক্ষ আশা করেছিল, উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হলে আরো নতুন নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালানো সম্ভব হবে। যদিও ঘটেছে এর উল্টো। বহরে প্রথম বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর (পালকি) উড়োজাহাজটি যুক্ত হওয়ার পর ২০১২ সালে পুনরায় ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইট চালু করে বিমান। উড়োজাহাজ সংকটে যা দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। তবে হজ ফ্লাইট চালাতে গিয়ে উড়োজাহাজ সংকটে ওই বছর ১৯ অক্টোবর আবারো বন্ধ হয়ে যায় ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইট, যা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়নি আজো।

১৯৮১ সালে ঢাকা-রোম-ঢাকা রুটে ফ্লাইট শুরু করে বিমান। তখন এ রুটে সপ্তাহে দুটি করে ফ্লাইট চলত। এক দশক পর ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে একটি করা হয়। পরে ২০১৪ সালের এপ্রিলে রোমের সঙ্গে ফ্রাঙ্কফুর্ট রুট যুক্ত করে ফ্লাইট শুরু হয়। ঢাকা-রোম-ফ্রাঙ্কফুর্ট রুটে ফ্লাইটপ্রতি গড়ে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা লোকসান হওয়ায় বন্ধ করা হয় রুটটি।

১৯৯২ সাল থেকে ঢাকা-দিল্লি ও ১৯৯৩ সাল থেকে ঢাকা-হংকং রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে এলেও হজ ফ্লাইট নির্বিঘ্ন করার যুক্তিতে ২০১৪ সাল থেকে এ দুটি রুটেও ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে বিমান।

১৯৯৩ সালে আমস্টারডাম হয়ে নিউইয়র্ক রুটের ফ্লাইট শুরু করে বিমান। পরবর্তী সময়ে ঢাকা-দুবাই-ব্রাসেলস-নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে সংস্থাটি। ডিসি-১০ উড়োজাহাজ দিয়ে নিউইয়র্ক রুটটি পরিচালনা করত বিমান। ঢাকা-দুবাই-ব্রাসেলস-নিউইয়র্ক রুটের প্রতি ফ্লাইটেই সে সময় ৩৫ লাখ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছিল। পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা থাকার পরও লোকসান ও উড়োজাহাজস্বল্পতার কারণ দেখিয়ে ২০০৬ সালের মার্চে নিউইয়র্ক রুটে সাপ্তাহিক ফ্লাইট তিন থেকে একটিতে নামিয়ে আনা হয়। একই সময় ব্রাসেলস রুটের ফ্লাইটও বন্ধ করে বিমান কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৯ জুলাই নিউইয়র্ক রুটের ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এ কারণে দীর্ঘ রুটে উড়তে সক্ষম বোয়িং দিয়ে ছোট রুটেই ফ্লাইট পরিকল্পনা করতে হচ্ছে বিমানকে। তাও কয়েকটি রুটে সীমাবদ্ধ। অথচ বিমানের বহরে নতুন প্রজন্মের এসব উড়োজাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য ছিল ইউরোপ-আমেরিকার মতো দীর্ঘ দূরত্বে ফ্লাইট চালানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ করা।

বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে আপাতত লন্ডন রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এছাড়া গুয়াংজু, কলম্বো, মালে রুটেও ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। কুয়েত, মদিনা, দিল্লি, হংকং ও টোকিওতে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা আছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বহরে আরো দুটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ যুক্ত হলে কলম্বো ও মালে রুট চালু করা হবে।

তবে লাভজনক না হওয়া পর্যন্ত ইউরোপের কোনো দীর্ঘ রুটে ফ্লাইট শুরুর পক্ষে নন বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ এনামুল বারী। বোয়িংয়ের সঙ্গে উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তির সময় নেগোসিয়েশন কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। মুহাম্মদ এনামুল বারী বলেন, লম্বা রুটে ফ্লাইট শুরুর জন্য বাজার যাচাই চলছে। বর্তমানে হিথ্রোয় সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট রয়েছে, যা ডিসেম্বর থেকে ছয়টি করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে আরো একটি নতুন রুট চালুর চেষ্টা চলছে। সেটা ম্যানচেস্টারও হতে পারে। এছাড়া বড় রুটের মধ্যে আমাদের প্রথম লক্ষ্য নিউইয়র্ক ও টরন্টো। টরন্টো রুটটি ভায়া আমেরিকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ক্যাটাগরির উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত এ দুটি রুট চালু করা যাচ্ছে না। বহরে থাকা ৭৭৭ উড়োজাহাজগুলো দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যেমন— রিয়াদ, দাম্মাম, জেদ্দায় ফ্লাইট চালানো হবে। মদিনায় দু-তিনটি ফ্লাইট দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বহরে দুটি ৭৩৭ উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করে রিজিওনাল রুটের মধ্যে শ্রীলংকা, গুয়াংজুতে ফ্লাইট চালানো হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রুট ম্যাপে দেখা যায়, বর্তমানে বিমানের আন্তর্জাতিক রুট কেবল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ই সীমাবদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েত, দাম্মাম, দোহা, রিয়াদ, জেদ্দা, আবুধাবি, দুবাই ও মাস্কাটে ফ্লাইট রয়েছে বিমানের। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরে ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান। এছাড়া স্বল্প দূরত্বে কলকাতা, ইয়াঙ্গুন ও কাঠমান্ডুতে ফ্লাইট রয়েছে এয়ারলাইনসটির। ইউরোপে কেবল লন্ডন রুটেই ফ্লাইট রয়েছে। এ হিসাবে একটি রুটের জন্যই বিমানবহরে থাকছে লম্বা দূরত্ব পাড়ি দিতে সক্ষম পাঁচটি উড়োজাহাজ।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সক্ষম উড়োজাহাজ নিয়ে ভুগতে হচ্ছে বিমানকে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ দূরত্বে ওড়ানোর জন্য আনা এসব উড়োজাহাজ দিয়ে স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের ফ্লাইট পরিচালনা বিমানকে ক্যাপাসিটি লসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

২০০৮ সালে বোয়িং কোম্পানি থেকে উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তির সময় বিমানের পর্ষদে ছিলেন কাজী ওয়াহিদুল আলম।  তিনি বলেন, বিমান কর্তৃপক্ষ ১০ বছরেও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সক্ষম উড়োজাহাজগুলো ব্যবহারে কোনো পরিকল্পনা করতে পারেনি। বর্তমানে ড্রিমলাইনার দিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় ফ্লাইট চালানো হচ্ছে, যা বিমানকে ক্যাপাসিটি লসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

রুট না থাকার পরও দীর্ঘ দূরত্বের এতগুলো উড়োজাহাজ ক্রয়ের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, সে সময় বিমান ফ্রাঙ্কফুর্ট, রোমসহ ইউরোপের বেশকিছু গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছিল। টোকিও ও হংকংয়েও ফ্লাইট ছিল। বর্তমানে বিমানের রুট কমে এলেও একসময় প্রায় ২৯টি রুট ছিল। কোনো এয়ারলাইনসই তার কার্যপরিধি ছোট করার চিন্তা করে না। ওই সময় পরিচালনা পর্ষদ চিন্তা করেছিল, ১০ বছর পর বিমান নিউইয়র্ক, টরন্টো, প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্টে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। লন্ডন ও রোমে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। এসব বড় দূরত্বে ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনা থেকেই আটটি বড় উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয়া হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ৮ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি উড়োজাহাজ ক্রয়ে ২০০৮ সালে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে বিমান। এর মধ্যে রয়েছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর ও চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ (ড্রিমলাইনার) উড়োজাহাজ। পরবর্তী সময়ে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের আরো দুটি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয় বিমান। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আনা হয় চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ। এগুলোর নামকরণ করা হয় পালকি, অরুণ আলো, আকাশপ্রদীপ ও রাঙা প্রভাত। ২০১৫ সালের নভেম্বরে আনা হয় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের নতুন আরো একটি উড়োজাহাজ; যার নাম দেয়া হয়েছে ‘মেঘদূত’। আর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিমানের বহরে যোগ হয়েছে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ ‘ময়ূরপঙ্খী’। সর্বশেষ গত আগস্টে যুক্ত হয়েছে একটি বোয়িং ৭৮৭ ‘ড্রিমলাইনার’।  সূত্র: বণিক বার্তা

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ