সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির পর গতকাল সোমবার প্রথম কার্যদিবসে আবারও বড় দরপতন ঘটেছে শেয়ারবাজারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হয়েছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক এদিন ২ শতাংশ বা ৮৮ পয়েন্ট কমে নেমে এসেছে চার হাজার পয়েন্টের নিচে। এতে করে প্রধান এ সূচকটি ২০১৩ সালের অক্টোবরের অবস্থানে ফিরে গেছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর প্রধান এ সূচকটি সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৯৪৬ পয়েন্টের অবস্থানে ছিল।

অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচকটিও কমতে কমতে গতকাল দিনশেষে ১২ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এদিন সূচকটি ২১৮ পয়েন্ট বা পৌনে ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২০৯ পয়েন্টে। সূচকের পাশাপাশি দুই বাজারে লেনদেনের পরিমাণও কমে গেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্রমাগত দরপতনের ফলে ডিএসইর সূচক চার হাজার পয়েন্টের ‘মনস্তাত্ত্বিক’ সীমার নিচে নেমে আসায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি চরম আস্থাহীনতায় ভুগছেন তাঁরা। বাজারে আরও দরপতন ঘটতে পারে এবং সূচক আরও নিচে নেমে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিক্রির চাপ বাড়ার কারণে একদিকে সূচকের পতন ঘটছে, অন্যদিকে তেমন ক্রেতাও নেই বাজারে।
নিষ্প্রাণ বাজারে এমন দরপতনের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও। তবে কেউ কেউ দরপতনের জন্য অনুমাননির্ভর বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিক্রেতার তুলনায় ক্রেতাসংকট তৈরি হওয়ায় বাজারে একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আবু আহমেদ বলেন, বাজারে ক্রেতা নেই, বিক্রেতা বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে নতুন কোম্পানি ঢুকেছে, সেই অনুপাতে টাকা বাজারে ঢোকেনি। ফলে ধীরে ধীরে বাজারে আস্থাহীনতা বেড়ে যাচ্ছে। এর পেছনে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন তিনি। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অর্থনীতির জন্যও এটা দরকার। এ ছাড়া শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের নীতিগত কিছু সহায়তা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে বড় দরপতনের ফলে গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯৬০ পয়েন্টে। ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বাজারে ডিএসইএক্স সূচকটি চালু হয়। এটির যাত্রা শুরু হয় ৪ হাজার ৫৫ পয়েন্ট থেকে। আর এখন সেটিরও নিচে নেমে গেছে এ সূচক। অথচ এ সময়ে সূচক গণনায় কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে।
ডিএসইতে আজ ৩০৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২১৮টিরই দাম কমেছে, বেড়েছে ৬৮টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। ডিএসইতে গতকাল ৩৩০ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ৫২ কোটি টাকা কম। আগের দিন বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ৩৮২ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
অন্যদিকে সিএসইতে আজ ২২০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টিরই দাম কমেছে, বেড়েছে ৪৪টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ২২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে আজ ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ১৭ কোটি টাকা কম। আগের দিন এই স্টক এক্সচেঞ্জে ৪২ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়।
ডিএসইতে আজ লেনদেনে শীর্ষে ছিল ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি। আজ প্রতিষ্ঠানটির ৩৫ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। এ ছাড়া লেনদেনে শীর্ষে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এসিআই ফর্মুলেশন, এসিআই, স্কয়ার ফার্মা, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, ইফাদ অটোস, বিএসআরএম স্টিল, গ্রামীণফোন, কেপিসিএল, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড প্রভৃতি।
টানা দরপতন ও সূচক চার হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গতকাল বিকেলে লেনদেন শেষে জরুরি ভিত্তিতে বিএসইসি শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি ট্রেক হোল্ডার (ব্রোকারেজ হাউস) ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে এ বৈঠক হয়। এতে ট্রেক হোল্ডার ও মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বাজারের ধারাবাহিক দরপতনের কারণ জানতে চাওয়া হয়। জবাবে কেউই সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কারণ জানাতে পারেনি বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
তবে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা এ সময় বিএসইসিকে বলেন, ডিএসইর সূচক চার হাজার পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় দরপতন ঠেকাতে ট্রেক হোল্ডার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সহায়তা চেয়েছে বিএসইসি।
জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বিকেল পাঁচটার পর শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকটি ট্রেক হোল্ডার ও মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে আলোচনার জন্য ডাকা হয়েছিল। তাঁদের কাছে আমরা বাজার পতনের কারণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। অধিকাংশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মনস্তাত্ত্বিক ভীতি থেকে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ অবস্থায় আমরা পতন ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা চেয়েছি এবং তাঁরা আমাদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।’