সহযোগী প্রতিষ্ঠানের লোকসানের ঘাটি টানতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাইজগুলো লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের দায় ব্যাংকগুলোকে বহন করতে হচ্ছে। আর লোকসান সমন্বয় করতে ব্যাংকগুলোর নীট লোকসান বেড়ে যাচ্ছে।

বছর শেষে লভ্যাংশ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ শেয়ার হোল্ডাররা। শীর্ষ নির্বাহীদের দাবির প্রেক্ষিতে ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নীতিমালা শিথিল করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগিরই এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করা হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। এ জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে আলাদা কোম্পানি হিসেবে গঠনের নির্দেশ দেয়। 

সূত্র মতে, সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠন করার আগে ব্যাংকগুলো তাদের মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ইচ্ছামাফিক বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু যখনই মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজকে আলাদা কোম্পানি হিসেবে গঠন করা হয়, তখন প্রতিটি কোম্পানি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং প্রন্দ্রীয় ব্যাংকের একক ঋণগ্রহীতার শর্থের আওতায় চলে আসে; অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মূলধনের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এর আগে ব্যাংকগুলো এক একটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল পুঁজিবাজারে। ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো আলাদা কোম্পানি গঠন হওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ এসব কোম্পানির ওপর বর্তায়।

২০১০ সালের শুরু থেকে পুঁজিবাজারের ভয়াবহ দরপতন হতে থাকে। এর প্রভাব পড়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ওপর।

২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়, যা ওই বছরের ২০ জুলাই এ-সংক্রান্ত এক গেজেট প্রকাশিত হয়। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ গেজেট জারির দিন থেকে তিন বছরের মধ্যে মোট মূলধনের ২৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে বলা হয়। এর ফলে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের নতুন বিনিয়োগে হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়।

জানা গেছে, আগে ব্যাংকগুলো তার মোট দায়ের ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বা শেয়ার ধারণ করতে পারত। মোট দায় বলতে ব্যাংকগুলোর মূলধন বাদে সব সম্পদের মূল্যের যোগফল বোঝাত। ওই সময় ব্যাংকগুলোতে পাঁচ লাখ কোটি টাকার মোট সম্পদ ছিল। কিন্তু সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনানুযায়ী ব্যাংকগুলো পরিশোধিত মূলধন, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি, রিটেইন আর্নিং ও শেয়ার প্রিমিয়াম অ্যাকাউন্টের সমন্বয়ে যে অর্থ থাকবে তার ২৫ শতাংশের বেশি অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তখন মোট সমন্বিত ৭০ হাজার কোটি টাকার মূলধনের ২৫ শতাংশ হিসেবে ব্যাংকগুলো শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তখন বেশির ভাগেরই বাড়তি বিনিয়োগ ছিল। এ বাড়তি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২১ জুলাইয়ের মধ্যে নেমে আনার নির্দেশনা দেয়া হয়। এর পর থেকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলো আর নতুন বিনিয়োগ করতে পারেনি। অনেকেই লোকসান সমন্বয় করার সুযোগ না পাওয়ায় এক দিকে পুঁজিবাজারে টাকার প্রবাহ কমে যায়, অন্য দিকে প্রতি বছরই পুঁজিবাজারের বিনিয়োগজনিত লোকসান সমন্বয় করা হয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা থেকে।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালেন্সসিট রিপোটিংয়ে মার্ক টু মার্কেট ভিত্তিতে করা হয়। অর্থাৎ কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক একটি কোম্পানি শেয়ার ১০০ টাকায় কিনলো। দাম কমে তা ৯০ টাকা হলো। নীতিমালা অনুযায়ী ৯০ টাকা আসল এবং ১০ টাকা লোকসান হিসেবে দেখাতে হয়। আর এ লোকাসান সমন্বয় করতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। 

গতকাল বৃহষ্পতিবার বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বেশিভাগ প্রতিষ্ঠানেরই বর্তমান বিভিন্ন শেয়ারের বাজার দর অনুযায়ী পুজিবাজারে বিনিয়োগকৃত অর্থের গড়ে ৬০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ হাওয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা যে দরে শেয়ার কিনেছিল ওই দিন বিক্রি করলে সমপরিমাণ অর্থ ফেরত পাবে না। এর মধ্যে এ মুহুর্তে বিক্রি করলে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ লোকসান দিতে হবে। 

এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ২৫ শতাংশের নামিয়ে আনতে না পারায় গত বছরের ২০ ডিসেম্বর ব্যাংকগুলোর লোকসান সমন্বয় করতে নীতিমালা শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওইসময় ১০টি ব্যাংকের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছিল। শিথিল করে বলা হয়, বাজারে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকগুলো যে মূলধন জোগান দিয়েছিল, তা আর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হবে না। এ নীতিমালা গত ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে।

ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও অনুরূপ সুবিধা দেয়ার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে 

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার