ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশ দেয়ার পরও বেসরকারি খাতের প্রিমিয়ার ব্যাংক গত বছর আমানত সংগ্রহের তুলনায় দশ গুণ বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। ব্যাংকটির ইসলামী ব্যাংকিং উইংয়ের আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ হলেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে ৬৫ শতাংশ। ফলে ব্যাংকের বিনিয়োগ আমানত (আইডিআর) অনুপাত ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪০ শতাংশে। অথচ থাকার কথা ছিল ৮৯ শতাংশে। নির্দেশনা না মানার কারণ জানতে চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির জবাব দিয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক। কিন্তু সেই ব্যাখ্যায়ও সন্তুষ্ট হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমন চিত্র পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। আইডিআর অনুপাত বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির জবাবে প্রিমিয়ার ব্যাংক জানায়, আগে অনুমোদন দেয়া আমদানি ঋণপত্রে (এলসি) বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া ও একই সময়ে শিল্প খাতে চলতি বিনিয়োগ দেয়ায় ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ের সার্বিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য নতুন বিনিয়োগ না দেয়া ও আমানত সংগ্রহ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী দেশে কার্যরত প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো সংগৃহীত মোট আমানতের মধ্যে সিআরআর ও এসএলআর বাবদ জমা রেখে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ হার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্র্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের লাগাম টেনে ধরতে এই হার প্রচলিত ব্যাংকগুলোর জন্য ৮৫ থেকে কমিয়ে ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ৯০ শতাংশ কমিয়ে ৮৯ শতাংশ করেছে। এ জন্য আইডিআর অনুপাত নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সমন্বয় করার জন্য দুই দফায় সময় বৃদ্ধি করে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় নির্দিষ্ট করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র মতে, গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের জারিকৃত সার্কুলারের পরেও প্রিমিয়ার ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিং করেছে। ব্যাংকটির গত এক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইসলামী উইংয়ের আমানত ছিল ৫৬৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। গত মার্চে তা কমে হয়েছে ৫২০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৪৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ আলোচিত সময়ে অনেক গ্রাহকই ব্যাংক ছেড়ে চলে গেছেন। ব্যাংকও নতুন আমানত সংগ্রহ করতে পারেনি সেভাবে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকটি ইডিএফ ও পুনঃঅর্থায়ন ছাড়াই ইসলামী উইংয়ে ঋণ দিয়েছে ৬৯১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। গত মার্চে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৪০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আলোচিত সময়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকটির আইডিআর অনুপাত ছিল ১২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের ফলে বছর ঘুরেই তা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে গত মার্চে দাঁড়িয়েছে ১৪০ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে এই সময়ে তা কমে আসার কথা ছিল।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাংকটির আমানত সংগ্রহ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অপর দিকে একই সময়ে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ হিসাবে ব্যাংকটি আমানত সংগ্রহের প্রায় দশ গুণ বেশি ঋণ দিয়েছে। এ রকম চিত্রে ব্যাংকটির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আমানতের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক। এ কারণে আইডিআর বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির বিপরীতে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকটিকে সতর্ক করতে ও পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।  সূত্র: নয়া দিগন্ত

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ