রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) বয়সসীমা কমানোর ফলে সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে গোটা ব্যাংকিং খাত। বেসরকারি ব্যাংকের এমডির বয়সসীমা ৬৫ বছর বহাল রেখে শুধু সরকারি ব্যাংকের এমডির বয়সসীমা ৬২ বছর করার অঘোষিত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে অর্থমন্ত্রণালয়।

 

বিদ্যমান আইনে ব্যাংক এমডিদের বয়সীমা ৬৫ বছর বহাল থাকলেও হঠাৎ এমডিদের বয়সসীমা নিয়ে এ ধরনের দ্বৈতনীতির কারণে ব্যাংকিং খাতে চরম বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে মেধাবী, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঙ্কটে পড়বে ব্যাংকিং খাত। সিনিয়র ব্যাংকারদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিপরীতে ব্যাংকিং খাত হবে মেধাশূন্য।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সুভঙ্কর সাহা বলেন, ৬৫ বছর পর্যন্ত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন। যেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনে বর্ণিত রয়েছে। তবে এ নির্দেশনা পরিবর্তনের বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।

একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, বয়সসীমা ৬৫ বছর হওয়ায় একজন এমডি জানাশোনা শেষে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেই তার কার্যকাল শেষ। বয়স কম হওয়ায় তার অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সময় পান না। সে ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের বয়সসীমার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা জরুরি। অর্থমন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক অঘোষিত সিদ্ধান্তে দেশের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ লোকবলের সংকট প্রকট হয়ে উঠবে।

অর্থমন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকিং খাতের একটি বিশ্বস্ত সূত্র অনুযায়ী, সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর এমডিদের চাকরির অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে নামিয়ে ৬২ বছর করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং নীতি ও প্রবিধি শাখার (বিআরপিডি) সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংকের এমডিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরদের চাকরির বয়স ৬২ বছর নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর এমডিদের চাকরির বয়সসীমা ৬২ করা হচ্ছে। যা ব্যাংকিং ও প্রবিধি নীতি বিভাগের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিআরপিডির সার্কুলার অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি সকল ব্যাংকের এমডিরা ৬৫ বছর পর্যন্ত চাকরি করতে পারবেন। কিন্তু হঠাৎ করে সরকারি ব্যাংকের এমডিদের চাকরির ক্ষেত্রে বয়স ৬২ বছর করায় একে ‘দ্বৈতনীতি’ বলে একাধিক অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন।

জানা গেছে, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছরের বেশি। সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী কোনো চাকরিজীবী ৬৫ বছরে অবসর গ্রহণ করার পরেও তার চাকরি করার অনেক সামর্থ ও যোগ্যতা থাকে। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত কিছু বিধি-বিধানের কারণে এখন কোনো এমডি ৬৫ বছরের বেশি চাকরি করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এমডিদের চাকরি বয়স ৬৫ বছরের মধ্যে থাকলে তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক হিসেবে রাখা যেতে পারে। কারণ সিনিয়র ও অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের দেশে যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তবে ৬৫ বছর পরে তাদের আর রাখার কোনো সুযোগ নেই।

একাধিক অর্থনীতিবিদ বলছেন, বয়সের বাধ্যবাধকতা নয়, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতেই দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে এমডি নিয়োগ দেওয়া উচিত। কারণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো সরকার তথা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এসব ব্যাংকে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ লোক এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে ব্যাংকিং খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। পাশাপাশি সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সোনালী, অগ্রণী, জনতা এবং রূপালী ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এমডির বিকল্প নেই।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর একাধিক গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের বিকল্প নেই। কারণ ব্যবসাবান্ধব ও ব্যবসা বোঝেন এবং অভিজ্ঞ ব্যাংকার না হলে ব্যাংক পরিচালনা করা অসম্ভব। অভিজ্ঞ ব্যাংকাররাই দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করে থাকেন। তাই এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে চুক্তিভিক্তিক হলেও অভিজ্ঞ এমডিদের ব্যাংকে পুনঃনিয়োগ দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ বলেন, ব্যাংক পরিচালনা করতে অভিজ্ঞ ব্যাংকার জরুরি। অভিজ্ঞ ব্যাংকার ছাড়া ব্যাংক পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর ধরে রাখলে হবে না। সরকারি ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক এমডি নিয়োগ দেওয়া উচিত।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার