বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির দায়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে কতজনের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি।

অর্থমন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা আসার পরই কেবল দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই সূত্র মনে করে, মূলত: আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম সুইফটের সাথে আরটিজিএস সংযোগের মাধ্যমেই রিজার্ভ তৈরীর ক্ষেত্র তৈরী করা হয়েছিল। আরটিজিএস সংযোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শ্রেণীর উর্ধতন কর্মকর্তা অতিউৎসাহিত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নীচের স্তরের কিছু কর্মকর্তার ওপর দায় চাপিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলে মূলহোতারা আড়ালেই থেকে যাবে।

জানা গেছে, রিজার্ভ চুরির পর সরকার গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটির রিপোর্টেই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ওই কমটিরি অন্তবর্তীকালীন রিপোর্টে বলা হয়, রিজার্ভ চুরির দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ দায়ী নন। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব অবহেলার প্রমান তারা পেয়েছে বলে বলা হয়। সুইফটের সাথে আরটিজিএস নামক নতুন সফটওয়্যার সংযোজন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। একই সাথে সুইফট কর্তৃপক্ষ ও ফেড’র কর্মকান্ড নিয়েও সমালোচনা করেন তারা। কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়। এর পর থেকেই নানা সমালোচনার ডালপালা মেলে। অবশ্য সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, অন্তবর্তীকালীন রিপোর্ট জমা দেয়ার সময় তারাহুড়া করে দেয়া হয়েছিল। ফলে ওইসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়ী থাকার বিষয়টি বলা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফরাসউদ্দিনের রিপোর্টে রিজার্ভ চুরির সাথে কিছু কর্মকর্তার জড়িত থাকার কথা বলেছেন। কিন্তু কত জন এর সাথে জড়িত, তারা কি সরাসরি জড়িত, বা রিজার্ভ চুরিতে সরাসরি জড়িত না থেকে সহযোগিতা করেছেন, নাকি দায়িত্ব অবহেলার কারণে দুষ্কৃতকারীরা রিজার্ভ চুরি করতে পেরেছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যদি রিজার্ভ চুরির সাথে সরাসরি কেউ জড়িত থাকেন তাহলে শাস্তি কি হেেব; আবার যদি রিজার্ভ চুরিতে কেউ সহযোগিতা করেন তাহলে কি ধরনের শাস্তি হবে; আবার যদি দায়িত্ব অবহেলার কারণে রিজার্ভ চুরি হয়ে থাকে তাহলে শাস্তি হবে অন্যরকম। এ কারণে ফরাসউদ্দিনের প্রতিবেদন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে দায়ীদের বিরুদ্ধে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ফরাসউদ্দিনের রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আইনগত মতামত নেয়া হচ্ছে আইনমন্ত্রণালয় থেকে। তাদের মতামত পাওয়া গেলেই অর্থমন্ত্রণালয় থেকে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকার গঠিত বিশেষ কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন রিপোর্ট প্রদানকালে সাংবাদিকদের কাছে যে বক্তব্য দেন তাতেও কিছু অস্পৃষ্টতার প্রমান পাওয়া য়ায়। যেমন, ড. ফরাসউদ্দিন অন্তবর্তীকালীন রিপোর্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়ে অস্বীকার করেন। কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার সময় বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই অল্প কিছু লোক ‘জেনেই হোক আর অজান্তেই হোক’ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ফরাস উদ্দিন আরও বলেন, ওই ঘটনার জন্য সুইফটসহ দেশের বাইরের কিছু প্রতিষ্ঠান এবং প্রন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তার সম্পৃক্তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুইফটের গাফিলতি আছে। তাদের ইঞ্জিনিয়াররা সুইফট ও আরটিজিএস নামে দুটি আন্তঃব্যাংক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করে দিয়েছে- যার কোনো দরকার ছিল না। মূল সমস্যা হচ্ছে আরটিজিএসের সঙ্গে সুইফটের কানেকশন এবং ওই কানেকসনের সময় সুরক্ষা কবচ উঠিয়ে দেয়া। এটা না হলে ওই ঘটনা ঘটত না। সুইফটের অনুরোধেই এটা করা হয় এবং করার সময় কিছু সুরক্ষা ফিচার নষ্ট করে ফেলে দেয়া হয়। এটা দেখেই আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীরা প্লান করে এ চুরিটা সংঘটিত করে।” ফরাস উদ্দিন বলেন, যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা দায়ী বলে মনে করেছিলাম, তাদের দায় কমেছে বলে মনে হয় না কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু লোকের সম্পৃক্ততা আমরা পেয়েছি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ড. ফরাসউদ্দিনের বক্তব্য থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমান মেলে না। আবার তিনি বলেছেন কিছু লোক জড়িত। কারা জড়িত তাদের বিষয়েও সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে, সুইফটের সাথে আরটিজিএস সংযোগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা অতিউৎসাহি ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারেও কিছু বলা হয়নি। মূলত: সুইফটের সাথে আরটিজিএস সংযোগ দিয়েই রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্র তৈরী করা হয়। অতিউৎসাহী কিছু কর্মকর্তা আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার জন্য তড়িঘড়ি করেছিলেন কেন, ওইসকল কর্মকর্তার ভ’মিকা নিয়েও কোনো কথা বলা হয়নি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। ফলে নীচের স্তরের কর্মকর্তাদের ওপর দায়ভার চাপিয়ে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে মূলহোতাদের আড়াল করা হচ্ছে কী না তারই বা নিশ্চয়তা কি। তবে সময়ই বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো জঘন্য ঘটনার সাথে কারা জড়িত বলে ওই সূত্র মনে করেন।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার