রিজার্ভ থেকে যে কোনো লেনদেনের তথ্যের মেসেজ জেনারেট করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফ্রন্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা। ভেরিভাই করে একই অফিসের অরেক কর্মকর্তা। আবার মেসেজ ট্রান্সশিপমেন্ট করে

একই বিভাগের আরেক কর্মকর্তা। আর মিডল অফিসের দুই কর্মকর্তা ফ্রন্ট অফিসের মেসেজ যথাযথ হয়েছে কী না তা তদারকি করে থাকে। রিজার্ভ ম্যানেজমেন্টের জন্য এ দুই অফিস নিয়ন্ত্রণ করে ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্টের বিভাগ। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাক অফিস। এ ব্যাক অফিস ফ্রন্ট ও মিডল অফিসের কাজগুলো ঠিকমত হচ্ছে কিনা বা পাঠানো বার্তা অনুযায়ী ঠিকমত রিজার্ভ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কেটে রাখা হয়েছে কিনা, দেশের রিজার্ভ কি পরিমাণে রয়েছে এগুলো দেখাশুনা করে। কিন্তু রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনায় তদন্ত করা হচ্ছে শুধু ব্যাক অফিসকে নিয়ে। এর ফলে প্রকৃত ঘটনা আড়াল হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যেসব বিভাগ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, ডিলিং রুমের সিসি ক্যামেরা অকেজো ছিল, সাভার ও কম্পিউটার থেকে তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে সে বিভাগে কোন তদন্ত হচ্ছে না। তদন্ত হচ্ছে যে বিভাগ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব নিকাশ রাখে, সেই বিভাগে। এই নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তারা বলেছেন, তদন্ত থেকে কাউকে বাচাতে বা তদন্তের ফলাফলকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পরিকল্পিতভাবে এটি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তদন্তকে একমুখী করছেন। তাদের পক্ষ থেকে অর্থমন্তক্রনালয়কেও ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দুই অফিসেই তদন্ত হওয়া উচিত। তাহলে প্রকৃত ঘটনা বের করা সম্ভব হবে । তা না হলে তদন্ত যেমন একমুখী হবে, তেমনি প্রকৃত ঘটনাটি বের হবে না। 

এদিকে, সদ্য নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি কনসালটেন্ট ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানার মৌখিক পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সকল বিভাগ, সেল, ইউনিট, উইং এবং শাখা অফিসসমুহের সকী কাম্পিউটারের পিসি, ল্যাপটপ ও সার্ভারসমূহে তার সরবরাহকৃত সিকিউরিটি প্যাচ নামক সার্ভার ইনস্টল করার নির্দেশে অনেকেই বিষ্মিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল তথ্য ফাঁস হওয়ার আশংকা করছেন অনেকেই। এ কারণে অনেক কর্মকর্তা রাকেশ আস্তানার সরবরাহকৃত সিকিউরিটি প্যাচ ইন্সটল করতে ভয় পাচ্ছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি অপারেশন এন্ড কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপ্যাল মেইনটিন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পংকজ কুমার মল্লিক স্বাক্ষরিত এ আদেশ গত ৬ মার্চ জারি করা হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরিরর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে কাজী ছাইদুর রহমানের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। 

এদিকে, অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সচিব এম আসলাম আলমের পরামর্শে আজ ১৫ মার্চ বাংরাদেশ ব্যাংকের জরুরী পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। কিন্তু অনিবার্য কারণবশত তা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল এ বিষয়টি নিশ্চত করেছেন  বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা। তিনি নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আজ অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ ব্যাাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা স্থগিত করা হয়েছে। রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, এ নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়ার পর তা প্রকাশ করা হবে।

এদিকে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন। যেমন-বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। অর্থমন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরকে তলব। এসব বিষয় নিয় গতকাল সারাদিনই গভর্নরের পদত্যাগ করছেন কি না এ নিয়ে গঞ্জন শোনা যায়। কেউ বলেন, গভর্নর আর থাকছেন না। আবার কেউ বলেন, তাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। গতকাল বিকেল ৫টা থেকে সোয়া ছয়টা পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীয় ড. আতিউর রহমানের জন্য তার সচিালয়ের অফিসে অপেক্ষা করেন। কিন্তু গভর্নর সন্ধ্যায় দিল্লী থেকে ঢাকায় নেমে সোজা বাসায় চলে যান। এ নিয়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী। আজ বেলা ১১টায় সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছেন তিনি। 

এদিকে, অর্থ চুরির এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ও ফরেক্স রিজার্ভের কয়েকজন কর্মকর্তার উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে এক সূত্র জানিয়েছে। এতে একাধিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ঠতা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে বেশকিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার কারণে সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেই তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

এদিকে রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনার চুলচেরা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ আরও দুটি দল। আইটির বিষয়টি দেখছে রাকেশ আস্থানা ও সদ্য নিয়োগ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফায়ার-আই নামক প্রতিষ্ঠান এবং র্যা ব আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে গত রোববার থেকে। এর বাইরেও ৩টি গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ ছায়া তদন্ত করছে।

এদিকে গতকাল অর্থমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর সাক্ষাত না করলেও রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করেছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। তবে সাক্ষাতে তিনি কী বলেছেন তা জানা যায়নি। 

এদিকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ নির্দিষ্ট চেয়ার বা কম্পিউটার ছেড়ে অন্য কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলছেন না। যথা নিয়মে অফিসে যাচ্ছেন। আবার কাজ শেষে যতদূর পারা যায় কারও সাথে তেমন কোনো কথা না বলে বাসায় ফিরছেন। এ নিয়ে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জানিনা বাংলাদেশ ব্যাংকের কপালে এমন দুর্গতি আর কখনো ঘটবে কী না।

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার