ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের অর্ধেকই ৫ ব্যাংকের দখলে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, মোট ৭৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকাই রয়েছে এই ৫ ব্যাংকের, যা মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ডিসেম্বরভিত্তিক তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণ করা হয়। অতীতেও এ ধরনের অনেক ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। আবার এসব ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতাও বেশি। এর ফলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ অনেক বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০১৭’-তে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে ৭৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের দখলে রয়েছে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি। আর শীর্ষ ৫ ব্যাংকের দখলে রয়েছে ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। বাকি ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ রয়েছে অন্য ৫৩ ব্যাংকের।

খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা ১০ ব্যাংকের মধ্যে ৫টিই সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক, ৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ১টি বিশেষায়িত ব্যাংক ও একটি বিদেশী ব্যাংক রয়েছে যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪টি সরকারি ব্যাংক, ২টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ২টি বিশেষায়িত ব্যাংক ও দুইটি বিদেশী ব্যাংক।

প্রতিবেদনে খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষি খাতে ঋণ গেছে ৩৭ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। একইভাবে তৈরী পোশাক খাতে ঋণ গেছে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৭৯০ কোটি টাকাÑ যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। খাতটিতে মোট ঋণের ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বিতরণ হলেও খেলাপি হয়েছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। সে হিসাবে এই খাতে ঋণের চেয়ে খেলাপির হার বেশি। পরিবহন খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ঋণ গেছে ১১ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকাÑ যা বিতরণ করা ঋণের ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। 

ব্যাংকগুলোর আয় দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়া। বেশির ভাগ ব্যাংকেরই মন্দঋণ বেড়ে গেছে। আর মন্দঋণ বেড়ে যাওয়ায় এসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। আর প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে। অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকের নিট আয় কমে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে দেয়া বড় অঙ্কের ঋণের বেশির ভাগই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে কিছু শিল্প গ্রুপের হাতে। ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশই মাত্র কয়েকটি শিল্প গ্রুপের হাতে আটকে রয়েছে। ফলে কোনো কারণে একটি গ্রুপ সমস্যা পড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো ব্যাংকিং খাতে। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে বড় বড় শিল্প গ্রুপ খেলাপি হয়ে যাওয়া। কোনো একটি গ্রুপের বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হলেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায় হাজার কোটি টাকার বেশি। একই কারণে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধির প্রবণতাও রয়েছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহীতা রয়েছে ৬৩১ জন। এদের কাছে নগদ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। এ ছাড়া তাদের কাছে পরো ঋণ যেমন এলটিআর (লোন এগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট), টিআর (ট্রাস্ট রিসিপ্ট), এলসি (ঋণপত্র), বিভিন্ন ধরনের বিল, বন্ধকী চেকসহ অন্যান্য ব্যাংকিং উপকরণের বিপরীতে ঋণ, ব্যাংক গ্যারান্টি আকারে এবং নানাভাবে নেয়া ঋণ প্রত্যক্ষ ঋণের চেয়ে পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেশি। যেগুলো দেয়া হয়েছে মূলত আমদানি বাণিজ্যের বা অন্য কোনো গ্যারান্টির বিপরীতে।

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ