এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরদিনই আমদানি পণ্য হাতে পাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বিডিবিএলে (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড)। এরপর ওই আমদানি পণ্যের বিপরীতে টাকার জন্য আবেদন করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে ওই অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে ঢাকা ট্রেডিং হাউস নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে। সূত্র জানায়, ব্যাংকের নিরীক্ষা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভুয়া কাগজপত্রে অর্থ লোপাটের তথ্য-প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে ওই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেশ করা হলে কমিশন সেটি যাচাই করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।

 

দুদকের অনুসন্ধানে জালিয়াতি করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ওই ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। এই কর্মকর্তা এরই মধ্যে জালিয়াতিপূর্ণ ওই ঋণ-সংক্রান্ত ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সংশ্নিষ্ট অন্যান্য নথি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছেন।

বিডিবিএলের বর্তমান এমডি মনজুর আহমদ বলেন, ২০১২ সালের ওই ঋণ প্রস্তাবটির ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক ও তাদের ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন সর্বাংশে সত্য। দুটি প্রতিবেদনেই ঋণ জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওই ঋণ জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

২০১২ সালে ওই জালিয়াতির সময়ের এমডি (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বিদেশ থেকে গম কেনার জন্য ঋণের আবেদনের সঙ্গে ঢাকা ট্রেডিং হাউস খাদ্য অধিদপ্তর থেকে যে সমঝোতা স্মারকটি এনেছিল, সেটি সঠিক ছিল না। এ ছাড়া ব্যাংকের সব ধরনের নিয়ম-কানুন মেনে ঋণটি প্রদান করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল না। গ্রাহকের কাছ থেকে যথাযথভাবে জামানতও গ্রহণ করা হয়েছিল। ব্যাংক-কাস্টমার সম্পর্কও ছিল চমৎকার।

জিল্লুর রহমান ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিডিবিএলের এমডির দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।

দুদক সূত্র জানায়, ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও গ্রাহক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরস্পর যোগসাজশে সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ওই ব্যাংকটির ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা ট্রেডিং হাউস জালিয়াতি করে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে খাদ্য অধিদপ্তরকে  ৫০ হাজার টন গম সরবরাহের একটি ভুয়া সমঝোতা চুক্তি তৈরি করেছিল। চুক্তিটি এই অধিদপ্তরের অনুকূলে ইস্যু দেখানো হয়েছিল ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল।

খাদ্যপণ্য ক্রয়ের বিপরীতে ৩০ কোটি টাকা ঋণের আবেদন জানিয়ে চুক্তিপত্রটি বিডিবিএলের ঢাকার মতিঝিলের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে পেশ করা হয়েছিল ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল। পরে ওই শাখা থেকে চুক্তিপত্রটি যাচাই না করে গ্রাহকের দাবিকৃত ৩০ কোটি টাকার এলটিআর (লোন ট্রাস্ট রিসিপ্ট) তৈরি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

২০১২ সালের ৪ জুন প্রস্তাবটির বিপরীতে ঋণ-সংক্রান্ত মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হয়। এর পরের দিন ৫ জুন ওই ৫০ হাজার টন গমের মধ্যে ১৫ হাজার টনের আমদানি এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়। আবার এর পরের দিন ৬ জুন এলসির বিপরীতে মালামাল বুঝে পেয়েছেন উল্লেখ করে অর্থছাড়ের জন্য শাখায় লিখিত অনুরোধ জানান ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিক টিপু সুলতান। এরপর ১৫ হাজার টন গমের বিপরীতে ২৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। এই সময় মতিঝিলের বিডিবিএলের প্রধান কার্যালয়ের নিচতলায় ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের দায়িত্বে ছিলেন সে সময়ের ডিজিএম সৈয়দ এনআর কাদরী। পরে তিনি জিএম হিসেবে পদোন্নতি পান। বর্তমানে অবসরে আছেন।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, এলসি খোলার পর ৩০ দিনের মধ্যে মালপত্র সরবরাহের কথা উল্লেখ ছিল ঋণ প্রস্তাবটিতে। এ ক্ষেত্রে আগের দিন এলসি খুলে পরের দিন মালপত্র বুঝে পাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক, অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, ওই ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের পেছনে পুরো ঘটনাই ছিল সাজানো।

দুদক জানায়, ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটি ঋণ-সংক্রান্ত নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম-কানুন মেনে ঋণ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে ছয় কোটি টাকার সিকিউরিটি মানি (এফডিআর লিয়েন) রাখা ও আগের পাওনা থাকলে তা পরিশোধের কথাও বলা হয়েছিল। ক্রেডিট কমিটির মতামত উপেক্ষা করে ব্যাংকের ওই সময়কার এমডি জিল্লুর রহমান প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করে পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করেছিলেন। ক্রেডিট কমিটির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও পর্ষদ সভায় প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক।

জানা গেছে, অডিট ফার্ম জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোং নিরীক্ষা করে খাদ্য অধিদপ্তরের নামে ইস্যু করা ওই সমঝোতা চুক্তিপত্র জাল বলে প্রমাণ পায়। ঋণ প্রস্তাবের নথিপত্রেও জাল-জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। নিরীক্ষকরা খাদ্য অধিদপ্তরে গিয়ে ওই সমঝোতা চুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা ট্রেডিং হাউসের সঙ্গে গম সরবরাহের চুক্তি হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও ওই ঋণের নথিপত্রে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।

ওই ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বিডিবিএলের পাঁচ কর্মকর্তাকে গত ৫ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। পর্যায়ক্রমে ওই সময়কার সংশ্নিষ্ট আরও কর্মকর্তা, এমডি ড. মো. জিল্লুর রহমান ও পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে। গত ৫ আগস্ট রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ওই পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান। জিজ্ঞাসাবাদ করা পাঁচ কর্মকর্তা হলেন- ব্যাংকের সাবেক জিএম সৈয়দ এনআর কাদরী, এজিএম দেওয়ান মোহাম্মদ ইসহাক, এসপিও দীনেশ চন্দ্র সাহা, তাহমিনা বানু ও কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কনসালট্যান্ট মাহে আলম।  সূত্র: সমকাল

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ