তিন মাসে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ ২৭ বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ৯৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০৭ কোটি টাকাই চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের। বাকি ৭২৬ কোটি টাকা ২৩ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের। ব্যাংকিং খাতে সুদ মওকুফের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। আর রাজনৈতিক প্রভাবেই সুদ মওকুফ করা হচ্ছে, যা ব্যাংকিং শৃঙ্খলা পরিপন্থী। ব্যাংকের সুদ মওকুফ করায় এক দিকে যেমন ব্যাংকের আয় কমে যায়, পাশাপাশি নিয়মিত ঋণপরিশোধ করেন এমন গ্রাহকদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে বেড়ে যায় ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা। ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ব্যাংক ভেদে সুদ মওকুফের দিক থেকে তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুদ মওকুফ হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। ব্যাংকটি তিন মাসে সুদ মওকুফ করেছে ১০১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সুদ মওকুফের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকটি তিন মাসে সুদ মওকুফ করেছে ৫৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর পরেই সোনালী ব্যাংকের ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংক ১৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, জনতা ব্যাংক ১ কোটি ২২ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে তিন মাসে।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিন মাসে ন্যাশনাল ব্যাংক একাই সুদ মওকুফ করেছে ৫৬৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এরপর সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক তিন মাসে সুদ মওকুফ করেছে ৩০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তিনি মাসে সাউথইস্ট ব্যাংক সুদ মওকুফ করেছে ১১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রাইম ব্যাংক সুদ মওকুফ করেছে ১৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংক সুদ মওকুফ করেছে ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। যমুনা ব্যাংক সুদ মওকুফ করেছে ১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

জানা গেছে, সাধারণত দু’টি ক্ষেত্রে সুদ মওকুফ করা হয়। একটি হলো, দীর্ঘ দিন যাবৎ যেসব ঋণ পরিশোধ করা হয় না, এককালীন পরিশোধের শর্তে ওইসব ঋণের কিছু সুদ মওকুফ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যাংক যেন লোকসানের সম্মুখীন না হয়, অর্থাৎ মূল বিনিয়োগ ও ব্যয় যেন উঠে আসে সে দিকে খেয়াল রাখা হয়। অপর দিকে ঋণ পুনঃতফসিলের সময় কিছু সুদ মওকুফ করা হয়। এটা করার ফলে এক দিকে ব্যাংকের দীর্ঘ দিনের খেলাপি ঋণ আদায় হয়। এতে ওই ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা বেড়ে যায়। অপর দিকে আয়ও বাড়ে।

বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে যাথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক চাপ থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়ীরা ঋণের সুদ মওকুফ করে নেন। যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাংক। কেননা ব্যাংককে আমানতকারীদের সুদ ঠিকই পরিশোধ করতে হয়েছে। কিন্তু ঋণের সুদ আদায় না হওয়ায় বেড়ে গেছে ব্যয়। শুধু সুদ মওকুফের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব থাকে না, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক চাপ থাকে। যেমন, ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহক ব্যাংকে যে জামানত দেন, তা যথাযথ হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বন্ধকী জমি বা সম্পদ অতিমূল্যায়িত করা হয়।

চার ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আশায় সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে সুদ মওকুফ বেড়ে গেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আয়ও কমে যাচ্ছে। 

রূপালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতের চেয়ে এখন ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক চাপ, স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে সরকারি এ চার ব্যাংকে সুদ মওকুফ বেড়ে গেছে। চাপও রয়েছে সুদ মওকুফ করার। এভাবে অনেকেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। সুদ মওকুফ বেশি হওয়ায় ব্যাংকের আয়ও কমে যাচ্ছে।  সূত্র: নয়া দিগন্ত

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ