ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপির পকেটে আটকে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ দিন যাবৎ পরিশোধ না করায় এখন তা কুঋণ বা মন্দঋণে পরিণত হয়েছে। শীর্ষ ২৫ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ের কৌশল নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। একই সাথে কমিটি গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সংসদীয় কমিটির কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সংসদীয় কমিটির পরামর্শ মোতাবেক শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হতে পারে। তারা কেন ব্যাংকঋণ পরিশোধ করছেন না সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে। যদিও এই ২৫ ঋণখেলাপির তালিকায় রাঘব বোয়ালদের নাম নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। শিগগিরই কমিটি গঠন করা হবে বলে ওই সূত্র জানায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৫০০ ও এক হাজার কোটি টাকার ওপরের ঋণখেলাপিদের মাত্র ১ ও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়নের বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধায় ১৪টি প্রতিষ্ঠান এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করেছেন। পুনর্গঠন করা না হলে খেলাপিদের তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠান শীর্ষে থাকত।

জানা গেছে, শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপির তথ্য চেয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ওই কমিটির সর্বশেষ বৈঠক হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। বৈঠকের সিদ্ধান্ত পাঠানো হয় বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিটির পক্ষ থেকে শীর্ষ ২৫ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা কী এবং কী উপায়ে এসব ঋণ আদায় করা যায় সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সাথে জানতে চাওয়া হয়েছে ঋণখেলাপি বন্ধে আইনের কী সংস্কার করা প্রয়োজন এবং উচ্চ আদালতেরই বা করণীয় কী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। একই সাথে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। কমিটি গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সংসদীয় কমিটির কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ঋণখেলাপি নিয়ে সেপ্টেম্বরে করা সর্বশেষ তালিকায় ৫০০ কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপির সংখ্যা এখন ৫ জন। এই পাঁচজনসহ শীর্ষ ২৫টি খেলাপি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল ১০ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় করেছে মাত্র ৯৩৫ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকাই দীর্ঘ দিন যাবৎ ব্যাংকের খাতায় কুঋণ হিসেবে আটকে রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে আদায় না হওয়ায় এ ঋণ এখন ব্যাংকের গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ এসব খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের আয় থেকে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। পাশাপাশি এসব ঋণের বিপরীতে অর্জিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মামলা করা হলেও দীর্ঘ দিন যাবৎ তা ঝুলে রয়েছে বলে ওই সূত্র জানায়।

গত সেপ্টেম্বরে তৈরি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে রয়েছে মোহাম্মদ ইলিয়াস ব্রাদার্স। চট্টগ্রাম খাতুনগঞ্জের দাদা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইলিয়াস ব্রাদার্সের কাছে ঋণ রয়েছে ৮৮৯ কোটি টাকা। পুরো ঋণই এখন খেলাপি। প্রতিষ্ঠানটি ১৫ ব্যাংক থেকে এ ঋণ নিয়েছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে এবি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

দ্বিতীয় শীর্ষ ঋণখেলাপি হলো কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেমস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ৭৪৪ কোটি টাকার মধ্যে ৫৫৮ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাসমির ভেজিটেবল ওয়েল লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠান এক টাকাও পরিশোধ করেনি। ৫৪৭ কোটি টাকা বকেয়া ঋণের মধ্যে পুরোটাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। চতুর্থ সর্বোচ্চ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হলমার্ক গ্রুপের ম্যাক্স স্পিনিং মিলস। সোনালী ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৫২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক টাকাও পরিশোধ করেনি। পঞ্চম সর্বোচ্চ খেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো বেনেটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া ৫৩৩ কোটি টাকার মধ্যে ৫১৬ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। ষষ্ঠ সর্বোচ্চ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠন হলো ঢাকা ট্রেডিং হাউজ। প্রতিষ্ঠানটি ছয় ব্যাংক থেকে ৪৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর পুরোটাই এখন খেলাপি। পাট রফতানিকারক এ প্রতিষ্ঠানটি কমার্স ব্যাংক, বিডিবিএল, এক্সিম ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, শাহজালাল ব্যাংক এবং সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল। সপ্তম সর্বোচ্চ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো আনোয়ারা স্পিনিং মিলস। এটিও সোনালী ব্যাংক থেকে ৪৭৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা নিয়ে একটি কানাকড়িও ফেরত দেয়নি।

অষ্টম শীর্ষ ঋণখেলাপি হলো সিদ্দিক ট্রেডার্স। ৫৯৯ কোটি টাকার মধ্যে ৪২৮ কোটি টাকাই পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। নবম অবস্থানে ইয়াসির এন্টারপ্রাইজ। ৪১৪ কোটি টাকার এক টাকাও ফেরত দেয়নি। ব্যাংকিং খাতে দশম শীর্ষ ঋণখেলাপি হলো আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক থেকে ৪০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এক টাকাও ফেরত দেয়নি। লিজেন্ড হোল্ডিংস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ৩৪৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কানাকড়িও ফেরত দেয়নি। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংক থেকে ৩৩৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে এক টাকাও পরিশোধ না করা হলমার্ক ফ্যাশন লিমিটেড দ্বাদশ শীর্ষ ঋণখেলাপি। আর ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল ৩৩৮ কোটি টাকা, মুন্নু ফেব্রিক্স ৩৩৮ কোটি টাকা, ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিক্স ৩২২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কানাকড়িও ফেরত দেয়নি।

শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় ১৬তম অবস্থানে রয়েছে, শাহারিশ কম্পোজিট টাওয়েল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি জনতা ব্যাংক থেকে ৩১৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেছে মাত্র চার লাখ। এ ছাড়া ১৭তম অবস্থানে নূরজাহান সুপার ওয়েল ৩০৪ কোটি টাকা, ১৮তম অবস্থানে কেয়া ইয়ার্ন প্রসেসিং ২৭৩ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এক টাকাও ফেরত দেয়নি। ১৯তম অবস্থানে সালেহ কার্পেট মিলস লিমিটেড অগ্রণী, বিডিবিএল, জনতা ও সোনালী ব্যাংক থেকে ২৮৭ কোটি১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পুরোটাই খেলাপি হয়েছে।

এ ছাড়া ফেয়ার ইয়ার্ন প্রসেসিং ২৭৩ কোটি টাকা এবং এ কে স্টিল ২৭১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এক টাকাও ফেরত না দিয়ে খেলাপির তালিকায় ২০ ও ২১তম অবস্থানে নাম লেখিয়েছে। অপর দিকে, ২২তম অবস্থানে থাকা চৌধুরী নিটওয়ার্স ২৭০ কোটি টাকা, হেল্পলাইন রিসোর্সেস ২৫৮ কোটি টাকা নিয়ে ২৩তম অবস্থানে; সিক্স সিজনস অ্যাপার্টমেন্ট ২৫৪ কোটি টাকা নিয়ে ২৪তম অবস্থানে এবং ২৫তম স্থানে থাকা বিসমিল্লাহ টাওয়েলস ২৪৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এক টাকাও পরিশোধ করেনি।  সূত্র: নয়া দিগন্ত

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ