দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূলধন সহায়তা বাবদ দুই হাজার কোটি টাকা দিতে চাচ্ছে না অর্থ বিভাগ। অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, প্রতি বছর মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য এসব ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তাই প্রতি বছর ব্যাংকগুলোর চাহিদামাফিক অর্থ দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ এই অর্থ জনগণের, এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার একটি ব্যাপার রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। উল্লেখ্য, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ রয়েছে সাড়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

 

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ছয়টি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য দুই হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়ার জন্য অর্থ বিভাগের কাছে অনুরোধ করা হয়। এই অনুরোধপত্রে বলা হয়, অর্থ বিভাগের অধীনে ৩-০৯৩৪-০০০০-৭১১৩ নং কোডের আওতায় ‘ব্যাংক মূলধন পুনর্গঠনে বিনিয়োগ’ খাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দ থেকে চলতি অর্থবছরে যেন ছয়টি ব্যাংকে অর্থ প্রদান করা হয়।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে পাঠানো চাহিদাপত্রে দেখা গেছে, চলতি বছর সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য চাওয়া হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের জন্যও ৪০০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের জন্য ৩০০ কোটি টাকা। বেসিকের জন্যও ৩০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য চাওয়া হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়নের ব্যাংকের জন্য চাওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, প্রতি বছর এই ব্যাংকগুলোকে মূলধন সহায়তা হিসেবে অর্থ দেয়া হয়। অর্থ দেয়ার সময় প্রতিবারই কিছু শর্ত আরোপ করা হয়। এই শর্তের মধ্যে থাকে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন করা। কিন্তু এই শর্তগুলো কখনোই আক্ষরিক অর্থে পরিপালন করা হয় না। ফলে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এখন আবার তাদের দুই হাজার কোটি টাকা দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি আরো বলেন, তবে রাজনৈতিক চাপে আমাদের এই অর্থ দিতে হয়। আমরা ঠেকানোর চেষ্টা করি, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। তবে যাই হোক, ব্যাংকগুলোকে মে-জুন মাসের আগে কোনো অর্থ দেয়া হবে না।

এ দিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত ৪ অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য অর্থ দেয়া হয়েছে ১০ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় খাতের বেসিক ব্যাংককে । এই ব্যাংককে মোট দেয়া হয়েছে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। বরাদ্দের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সোনালী ব্যাংকে। এটিকে দেয়া হয়েছে ৩০০৩ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে জনতাকে ৮১৪ কোটি টাকা, অগ্রণীকে এক হাজার ৮১ কোটি টাকা, রূপালীকে ৩১০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে ৭২৯ কোটি ৮৬ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।

এর আগে এ বছরের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ চায়। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ চেয়েছে সোনালী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বৃহত্তম এই ব্যাংকটি মূলধন ঘাটতি পূরণে চেয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। এই ব্যাংকটিই ‘হল-মার্ক’ কেলেঙ্কারির কারণে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অন্য দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক জনতা মূলধন ঘাটতি পূরণে চেয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই ব্যাংকটিও ‘অ্যাননটেক্স’ নামে একটি অখ্যাত গ্রুপকে নিয়মনীতি না মেনে পাঁচ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।

দুর্নীতির কারণে আলোচিত অপর ব্যাংক বেসিকও মূলধন পূরণে চেয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই ব্যাংকটি ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়ম ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার মূলধন হারিয়েছে। মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য রূপালী ব্যাংকের প্রয়োজন ১২৫০ কোটি টাকা। অন্য দিকে বিশেষায়িত ব্যাংক বলে বিবেচিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এ খাতে চেয়েছেÑ সাত হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা ও ৮০০ কোটি টাকা।

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ