তারল্য সংকটের কারণে সরকারের পাওনা রাজস্ব পরিশোধ করতে পারছে না নতুন প্রজন্মের দ্য ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেড। আমানতের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমানতের ওপর প্রযোজ্য উেস আয়কর ও উেস মূল্য সংযোজন কর (মূসক) পরিশোধে ছয় মাসের সময় চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করেছে ব্যাংকটি।

 

এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এ-সংক্রান্ত এক চিঠিতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহসান খসরু উল্লেখ করেছেন, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর ভালোভাবে পরিচালিত হলেও ফারমার্স ব্যাংক বর্তমানে সংকটে পড়েছে। ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম হিসাবে ছিল ৪ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। সম্প্রতি ব্যাংকটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রকাশ হওয়ায় আমানত অনেক কমে গেছে। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আমানত ৪ হাজার ৫৯২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে ঋণ ও অগ্রিম হিসাব বেড়ে ৫ হাজার ৯৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ফলে তারল্য সংকটে ভুগছে ফারমার্স ব্যাংক। এ অবস্থায় ব্যাংকটির পক্ষে এ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিবদ্ধ তারল্য সঞ্চিতি (এসএলআর) ও নগদ সঞ্চিতি (সিআরআর) শর্ত পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আমানতের টাকাও ফেরত দেয়া যাচ্ছে না।

শিগগিরই তারল্য কাটিয়ে কর ও ভ্যাট পরিশোধ করা যাবে উল্লেখ করে চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ মূলধন ৪০১ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করতে যাচ্ছে ব্যাংকটি। শিগগিরই তারল্য সংকট কাটিয়ে সব ধরনের উেস কর ও উেস ভ্যাট প্রদান করতে পারব বলে আমরা আশা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহসান খসরু গণমাধ্যমকে বলেন, বিদ্যমান সংকটের কারণেই এনবিআরের কাছে সময় চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের গ্রাহকদের কথা চিন্তা করেই এনবিআর বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সংকট কাটিয়ে উঠতে আমরা এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন করে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর বিষয়টিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিদিনই ২-৩ কোটি টাকা আদায় করছি। আমানত সংগ্রহে একটি সক্রিয় টিম গঠন করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শাখা পর্যায়ে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কর্মোদ্যম বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহে জোর দেয়া হয়েছে। আমি আশা করছি, ফারমার্স ব্যাংক শিগগিরই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

উেস কর ও উেস ভ্যাট পরিশোধে ফারমার্স ব্যাংক সময় চাইলেও ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ এবং ১৯৮২ সালের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনে এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান এনবিআর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী আমানত সমন্বয় হলেই এর সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উেস কর দিতে হয় ব্যাংকগুলোকে। গ্রাহকদের হিসাব যখন ক্লোজ হবে, তখনই এ কর পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সময় নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্ধারিত ভ্যাটও নিয়মিতই পরিশোধ করতে হয়। ফারমার্স ব্যাংককে এ সুবিধা দিতে গেলে উভয় আইনে বিশেষ ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হবে এনবিআরকে।

এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (আয়কর) নীতি কানন কুমার রায় বলেন, আমানতের বিপরীতে উেস কর পরিশোধে সময় চেয়ে ফারমার্স ব্যাংকের দেয়া আবেদনটি আমরা এখনো পাইনি। তাদের আবেদন পেলে আইনি বিষয় খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে এনবিআর।

২০১৩ সালের জুনে যাত্রা শুরু করে বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংক। কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই ব্যাংকটি আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পরিদর্শনে উঠে এসেছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৩ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে ফারমার্স ব্যাংক। একই সময়ে ৫৪টি শাখার মধ্যে ব্যাংকটির ২৮ শাখাই লোকসানে চলে যায়। এরপর থেকে আর্থিক বিপর্যয় আরো বেড়েছে ফারমার্স ব্যাংকের।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির ৩৭৮ কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন কারণে এরই মধ্যে ব্যাংকটির ৭৫ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

কার্যক্রম শুরুর এত অল্প সময়ে এত বড় অংকের মূলধন ঘাটতির ঘটনা বাংলাদেশে এটিই প্রথম। আইন অনুযায়ী, প্রচলিত ধারার যেকোনো ব্যাংক ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। কিন্তু আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ফারমার্স ব্যাংক ৯০ শতাংশের বেৃিশ টাকা ঋণ দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে গত ২৭ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে মহীউদ্দীন খান আলমগীর পদত্যাগে বাধ্য হন। ব্যাংকটির পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্যাংকটির তত্কালীন এমডি একেএম শামীমকে সরিয়ে এহসান খসরুকে দেয়া হয় এমডির দায়িত্ব।

 

বাংলাবিজনিউজ/আরাফ