বিদায়ী বছরজুড়ে আগ্রাসী ব্যাংকিং করেছে দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের অধিকাংশ ব্যাংক। গত ছয় মাসে আমানত প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ হারে ঋণ বিতরণ করেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এতে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকেই তারল্য বা নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডি রেশিও কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে গতকাল দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর ফজলে কবির। গতকালের ওই ব্যাংকার্স সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। তিন ডেপুটি গভর্নরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন।

গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নিয়ে ঋণ বিতরণ করাই ব্যাংকের প্রধান কাজ। এক্ষেত্রে দেশের সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। তবে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারে সর্বোচ্চ ৯০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকেরই এডি রেশিও ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকে সৃষ্টি হয়েছে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আগ্রাসী বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেন গভর্নর।

বৈঠক শেষে ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে যে হারে ঋণ বিতরণ হচ্ছে, সে হারে আমানত না আসায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য বিদ্যমান এডি রেশিওর হার কমিয়ে আনার বিষয়ে ব্যাংকার্স সভায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমডিদের নিজ থেকে এডি রেশিও কমাতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পরবর্তীতে সার্কুলার ইস্যু করে এডি রেশিওর নতুন হার নির্ধারণ করে দেয়া হবে। এ হার সাধারণ ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ৮০ ও ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশের কিছুটা বেশি হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ (এসএলআর) বাদ দিয়ে এ হার নির্ধারণ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে এখন থেকে ব্যাংকগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

যে হারে ঋণ গেছে, সে হারে আমানত না আসায় এডি রেশিও বেড়ে গেছে বলে সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণকৃত ঋণ যথাযথ খাতে গেছে কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ঋণ যে হারে গেছে, সে হারে আমানত আসেনি। ফলে ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ৮৫ শতাংশের বেশি এডি রেশিও কোনো ব্যাংকের থাকতে পারবে না।

দেশের বিদ্যমান জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতে ১৫-১৬ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গেছে। বিষয়টি পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকার্স সভায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমাতে এমডিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে ডেপুটি গভর্নর নিশ্চিত করেন।

গত বছরজুড়ে বেড়েছে দেশের আমদানি ব্যয়। সে তুলনায় রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়েনি। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কীভাবে ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়েও ব্যাংকার্স সভায় আলোচনা হয়েছে।

এসকে সুর চৌধুরী এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ভোক্তাঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এজন্য ব্যাংকার্স সভায় এমডিদের সতর্ক করা হয়েছে। বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে ঋণ বিতরণ না বাড়িয়ে বরং ঋণের গুণগত মান বৃদ্ধি ও মানসম্পন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণ বাড়াতে বলা হয়েছে।

চলতি মাসের শেষ দিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। ব্যাংকার্স সভায় মুদ্রানীতির নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। মুদ্রানীতি ঘোষণার দিন দেশের ব্যাংকিং খাতের হালনাগাদ চিত্রগুলো গভর্নর তার বক্তব্যে তুলে ধরবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুদ্রা বিনিময় হার যেন না বেড়ে যায়, সে বিষয়ে বৈঠকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আদালতের পরিবর্তে ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বিয়াকের মাধ্যমে খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায় সন্তোষজনক নয় বলে মত দিয়েছেন ব্যাংকের এমডিরা। গতকালের ব্যাংকার্স সভায় একাধিক ব্যাংকের এমডি এ নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ তুলে ধরেন।

এ প্রসঙ্গে ডেপুটি গভর্নর বলেন, খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে বিয়াকের মধ্যস্থতায় টাকা আদায় প্রক্রিয়া নিয়ে এমডিরা নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। এজন্য পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিয়াকের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই বৈঠকে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিয়াকের সমস্যাগুলো শোনা হবে। টাকা আদায়ে কোনো আইনগত ত্রুটি থাকলে সবাই মিলে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টির সমাধান বের করা হবে।

ব্যাংকার্স সভায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা এডিআর বা বিয়াকের মাধ্যমে সমঝোতায় আসবে না। এজন্য অর্থঋণ আদালতসহ আইনি কাঠামো নিয়ে আমাদের কথা তুলে ধরেছি।

সম্প্রতি দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক পণ্য আমদানির স্বীকৃত বিল পরিশোধ করেনি। বিদেশী বিভিন্ন ব্যাংক বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে একাধিকবার অভিযোগও করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকার্স সভায় এমডিদের সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসকে সুর চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বীকৃত বিল পরিশোধ না করার বিষয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এজন্য ব্যাংকগুলোকে যথাসময়ে স্বীকৃত বিল পরিশোধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় অভিযুক্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে টাকা পরিশোধ করে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। কিন্তু সে আপত্তি গ্রহণযোগ্য হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে টাকা পরিশোধ করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে ব্যাংকার্স সভায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে বাংলাদেশী এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো বিভিন্ন হারে কমিশন রাখে। এতে প্রবাসীদের পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অগ্রণী ব্যাংক ৬০ টাকা, ইসলামী ব্যাংক ৫০ টাকা এবং অন্য ব্যাংকগুলো বিভিন্ন হারে প্রতিটি লেনদেনে কমিশন রাখছে। কিন্তু জনতা ব্যাংক ১৫ টাকা কমিশনের বিনিময়ে একই সেবা দিচ্ছে প্রবাসীদের। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকার্স সভায় সব ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজকে কমিশনের হার ২০ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

চাকরিপ্রার্থীদের আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে অনেক আগে থেকেই ব্যাংকগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া ফিমুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের এমডিদের পক্ষ থেকে গতকালের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। আবেদনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০০ টাকা ফি নেয়ার বিষয়টি প্রস্তাব করেন ব্যাংক এমডিরা। এক্ষেত্রে এমডিদের যুক্তি ছিল, বিনাপয়সায় আবেদনের সুযোগ পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী আবেদন করছেন। প্রার্থীদের চাকরির পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংককে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এজন্য আবেদনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম একটি ফি নির্ধারণ করে দিলে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমার পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যাও কমবে।

তবে ব্যাংক এমডিদের প্রস্তাব নাকচ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, একজন বেকার যুবক চাকরির জন্য যদি ১০টি ব্যাংকে আবেদন জানান, তাহলে তার ২ হাজার টাকা খরচ হবে। বিষয়টি যেকোনো বেকার যুবকের জন্য কষ্টকর। ব্যাংক যেহেতু অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, সেহেতু চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পরীক্ষার ব্যয় মেটানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এজন্য বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে জানান এসকে সুর চৌধুরী।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পক্ষ থেকে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয় ব্যাংকার্স সভায়। এতে তিন ধরনের সুইফট সিস্টেম, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে কী ধরনের হ্যাকিং হতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে হ্যাকিংয়ের বিষয়গুলো আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে বলে এসকে সুর চৌধুরী জানিয়েছেন।

গত বছর বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংকে পরিবর্তন এসেছে। এ বিষয়ে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পর্ষদে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেকোনো পরিবর্তন আসতে পারে। সেটিকে আমরা স্বাগতও জানাই। কিন্তু পরিবর্তন যেন হঠাত্ করে না হয়। অস্বাভাবিক পন্থায় আকস্মিকভাবে যদি কোনো বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে, তাহলে অনেক ধরনের সমস্যা হতে পারে। আমানতকারীরাও আতঙ্কে থাকে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষ যেন আস্থা হারিয়ে না ফেলে। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর মহোদয় বলেছেন, বিষয়টি আমরা দেখব।

ব্যাংকগুলোর পরিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে এবিবির উদ্বেগের বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেন, পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত ব্যাংকগুলোর শেয়ার কিনে পর্ষদের পরিবর্তন বাজারের স্বাভাবিক ফেনোমেনা। আইনের মধ্য থেকে কোনো পরিবর্তন এলে সেটি নিয়ে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যখন যেটি করা দরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক সেটিই করছে। অন্যায্য বা অন্যায়ভাবে যদি কোনো পরিবর্তন আসে, বাংলাদেশ ব্যাংক সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

এছাড়া ব্যাংকার্স সভার সর্বশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

বাংলাবিজনিউজ/আ.হোসেন