সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও আর্থিক সেবাবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিংসেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে নেয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। সে সময় ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা জমা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দেয়া হয় সুবিধাবঞ্চিতদের। এর মধ্যে কৃষকদের জন্য নেয়া হয় ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার বিশেষ উদ্যোগ। চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এসব বিশেষ ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৬১ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে কিছুটা ভিন্ন প্রবণতা দেখা গেছে কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রে।

চালুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও ২০১৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে হিসাবের সংখ্যা কমেছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান হিসাবগুলোর ৯০ শতাংশেই কোনো লেনদেন হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৬৮। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ১ হাজার ৫২ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি ব্যাংক হিসাবে গড়ে জমা হয়েছে প্রায় ৬৫২ টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে এ ধরনের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ৩৯ হাজার ১৫৪। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এর সঙ্গে আরো ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭১৪টি ব্যাংক হিসাব যুক্ত হয়েছে। কিন্তু উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রে।

গত বছরের ডিসেম্বরে কৃষকদের ১০ টাকার হিসাবের সংখ্যা ছিল ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪। চলতি বছরের জুন শেষে এ সংখ্যা ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৯তে দাঁড়িয়েছে। অর্থাত্ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কমেছে ৫১৫টি হিসাব। জুন পর্যন্ত কৃষকদের ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৯টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ১৯২ কোটি ৯৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ টাকা। এ হিসেবে গড়ে প্রতিটি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে প্রায় ২১৬ টাকা। আবার এসব হিসাবের প্রায় ৯০ শতাংশেই কোনো লেনদেন হচ্ছে না বলেও জানা গেছে।

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও আর্থিক সেবাবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিংসেবার আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে দেশের ব্যাংকগুলোর প্রতি নির্দেশনা দিয়ে আসছে। এরই অংশ হিসেবে ২০১০ সালে নেয়া হয় বিশেষ ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ। ন্যূনতম ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা জমা দিয়ে এসব হিসাব খোলার বিধান রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে যেকোনো ব্যাংকে গিয়ে এ হিসাব খুলতে পারেন সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক এসব হিসাবে ন্যূনতম স্থিতি রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ কিংবা কোনো ধরনের চার্জ নিতে পারে না।

এ সেবার আওতায় কৃষক, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী, মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র জীবন বীমা পলিসিগ্রহীতা, অতিদরিদ্র উপকারভোগী, অতিদরিদ্র নারী উপকারভোগী, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির সুবিধাভোগী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুস্থ পুনর্বাসনের অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী, তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, চামড়া ও পাদুকা শিল্পকারখানার শ্রমিক, স্কুল শিক্ষার্থী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে অনুদানপ্রাপ্ত দুস্থ ব্যক্তি, আইলাদুর্গত ব্যক্তি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধী রয়েছে। ২০১৪ সালে কর্মজীবী পথশিশু-কিশোরদের ব্যাংকিংসেবার আওতায় আনতে আরেকটি সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এখন পর্যন্ত অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় খোলা হয়েছে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৩টি হিসাব। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ২৭১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ২ লাখ ২০ হাজার ৪৪টি ব্যাংক হিসাবে ১৭২ কোটি ৬০ লাখ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগী ৪০ লাখ ৪১৫টি ব্যাংক হিসাবে ১৭২ কোটি ৬০ লাখ, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৬৪ হাজার ৩৮৮টি ব্যাংক হিসাবে ৭২ লাখ টাকা জমা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত আটটি ব্যাংকের মধ্যে জুন শেষে কৃষকদের হিসাব ব্যতীত বিশেষ ব্যাংক হিসাব খোলার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগী হিসাবসহ মোট ৪৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২২টি ব্যাংক হিসাব চালু করেছে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোয় স্কুল ব্যাংকিং খাতের হিসাব ছিল ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৩টি। জুন শেষে এ খাতে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৬টি ব্যাংক হিসাব বেড়ে ১১ লাখ ৮২ হাজার ১৭৯টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে একই সময়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৬টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব হ্রাস পেয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৬টি ব্যাংক ১২টি এনজিওর সহযোগিতায় মোট ৩ হাজার ৪৬৫টি ব্যাংক হিসাব চালু করেছে। পথশিশুদের এসব ব্যাংক হিসাবে জমার পরিমাণ ২২ লাখ ১১ হাজার ৭০০ টাকা। এক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মাসাস’ ও সাফের সহযোগিতায় ব্যাংকটি জুন শেষে ১ হাজার ৫৬টি পথশিশু ব্যাংক হিসাব চালু করে। এসব ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও আর্থিক সেবাবহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিংসেবার আওতায় নিয়ে আসার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার বিশেষ ব্যাংক হিসাব চালু করেছে। জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। দেড় কোটিরও বেশি প্রান্তিক মানুষকে ব্যাংকগুলো সেবার আওতায় নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। চালু করা ব্যাংক হিসাবগুলোর কিছু অংশ লেনদেন না করায় অচল রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে বিশেষ তহবিল চালু করে ব্যাংক হিসাবগুলো সচল রাখায় সচেষ্ট রয়েছে।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার