# গ্রাহক ঝুঁকে পড়ছে সঞ্চয়পত্রে 

# দুইমাসে রেকর্ড বিনিয়োগ

আমনতের সুদহার কমে তলানিতে নেমেছে। আমানত রেখে বছর শেষে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে আমানতের অর্থ। মুনাফার আশায় তাই আমানতকারীরা ছুটছেন সঞ্চয়পত্রের দিকে। আর এরই নমুনা পাওয়া যায় গত দুই মাসের সঞ্চয়পত্রের (জুলাই-আগস্ট) বিনিয়োগের ধরণ থেকে। গত দুই মাসের ব্যবধানে রেকর্ড অর্থাৎ সাড়ে ৬৮ ভাগ বিনিযোগ বেড়েছে এ খাতে। আর গত এক মাসেই (আগস্টে)বেড়েছে ৬২ শতাংশ। অস্বাভাবিকভাবে বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের আমানত সংগ্রহেও ভাটা পড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিনিয়োগ স্থবিরতায় ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ ব্যাংকের হাতেই বলা চলে অলস অর্থ রয়েছে। ব্যাংক আমানতকারীদের কেছ থেকে যে পরিমাণ আমানত নিচ্ছে তা বিনিয়োগ করতে পারছে না। এতে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে গেছে। আর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে ব্যাংকগুলো আর বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে না। বরং দিন দিন তা কমিয়ে দিচ্ছে। আমানতের সুদহার কমতে কমতে এখন তা ব্যাংক রেটের অর্থাৎ ৫ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। 

ওইসূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকে আমানত রেখে গ্রাহকও ঘাটতির মুখে পড়ছে। অর্থাৎ ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে আমানত। কারণ, ১০০ টাকা আমানত রেখে সর্বোচ্চ মুনাফা পাচ্ছে এখন ৭ টাকা। এ ৭টাকার ওপর গ্রাহকের টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ এবং টিআইএন থাকলে ১০ শতাংশ কর কেটে নিচ্ছে সরকার। এরবাইরে ব্যাংকের নানা সার্ভিসচার্জতো রয়েছেই। সবমিলে এখন ১০০ টাকা আমানত রেখে গ্রাহক সর্বোচ্চ নীট মুনাফা পাচ্ছে ৫ টাকা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখন ৬ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে শুধু মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে একজন গ্রাহক ব্যাংকে ১০০ টাকা আমানত রাখলে বছর শেষে প্রকৃতপক্ষে ১ টাকা ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বছর শেষে তার ১০০ টাকা থেকে ১টাকা কমে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে আমানতকারীরা ব্যাংকে আমানত রাখতে দিন দিন নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন। ব্যাংক থেকে যারা আমানত প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। দেশের প্রথম প্রজম্মের একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, আগে গ্রাহক তার বেশিরভাগ উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংকে সঞ্চয় করতো। এখন বলা চলে বেশিরভাগই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। উপরন্তু অনেকেই ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়ে  সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখানে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই নিরূপায়। কারণ, ব্যাংক আমানত নিলে বছর শেষে বা নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সুদ আসলে আমানতকারীদের পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আমানতের অর্থ ব্যাংক বিনিয়োগ করতে না পারলে পুরোপুরিই ব্যাংক লোকসানের সম্মুখীন হয়। আবার বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও ভাল নয়। আগের মতো ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নিয়েছেন তারা পরিশোধ করতে পারছেন না। এর ফলে প্রতিটি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। এতে ব্যাংক পড়েছে উভয় সংকটে। একদিকে তারা আমানত নিয়ে কাঙ্খিত হারে বিনিয়োগ করতে পারছেন না, অপরদিকে যাদের কাছে বিনিয়োগ করেছেন তারাও ঠিক মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায়, ব্যাংক বিকল্প উপায়ে যে টুকু মুনাফা করছে তারও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি ঋণ খেয়ে ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের মুনাফার অর্থ দিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে তাদের আমানতের সুদহার কমানোর এ মূহুর্তে বিকল্প কোনো পথ নেই।

আর এ কারণেই গ্রাহক নিরূপায় হয়ে ব্যাংকের পরিবর্তে সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকে পড়ছে। প্রসঙ্গত, সঞ্চয়পত্রে এখনও ১০০ টাকার বিপরীতে ১০ টাকার ওপরে মুনাফা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক মাসে অর্থাৎ আগস্টেই সঞ্চয়পত্রে নীট বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই এ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে রেকর্ড ৬২ দশমিক ১৫ ভাগ। আর দুই মাসের হিসেবে এ হার আরও বেশি। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্রে নীট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬৮ শতাংশ।

দেশের দ্বিতীয় প্রজম্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, যে হারে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ হচ্ছে এটা অব্যাহত থাকলে সামনে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল সংকটে পড়ে যাবে। কারণ, বর্তমানে বিনিয়োগ স্থবিরতার মাঝে আমানত সংগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়লেও তেমন প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ স্বাভাবিক হলে তখন বিনিয়োগযোগ্য তহবিল ব্যাংকের হাতে থাকবে না। এর প্রভাব সামগ্রিক বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার