শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে অচিরেই বিশ্বে প্রথম স্থান দখল করবে।’ রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো প্রশিক্ষিত এসএমই ফ্যাশন ডিজাইনারদের প্রস্তুতকৃত পোশাক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আশা ব্যক্ত করেন।

 

আমির হসেন আমু বলেন, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত। রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্য সংযোজন ও জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে এ শিল্প খাতের ব্যাপক অবদান রয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। অচিরেই এটি বিশ্বে এক নম্বর স্থান দখল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি আমি বিশ্ব বিনিয়োগ ফোরামে যোগ দিতে কেনিয়া সফর করেছি। সেখানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড) এর মহাসচিব ড. মুখিসা কিটুইয়ের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকে বাংলাদেশের উদীয়মান তৈরি পোশাক শিল্প অচিরেই বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করবে বলে আঙ্কটাডের মহাসচিব অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আমার সাথে আলোচনাকালে তিনি তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতির দৃষ্টান্ত বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।

শিল্পমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ব ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দের এ ধরনের ইতিবাচক ধারণা শুধু শুধু হয়নি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা এবং মনোবলের কারণে বিশ্বমন্দার মাঝেও আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এ শিল্প অন্যতম চালিকা শক্তি। বর্তমানে দেশের গার্মেন্ট শিল্প কারখানাগুলোতে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করছে। এর ৮০ শতাংশই নারী। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ২০২১ সালে এ শিল্প খাতে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বর্তমান সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশেই তৈরি পোশাক শিল্প খাতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল সৃষ্টির উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। 

তিনি আরো বলেন, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতে কর্মরত জনবলের ৫ শতাংশ পেশাদার, ১৫ শতাংশ দক্ষ, ৩৫ শতাংশ আধাদক্ষ এবং ৪৫ শতাংশ অদক্ষ জনবল কর্মরত আছে। এ ছাড়া এ সেক্টরে এখন প্রায় ৩৮ হাজার কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন এবং পণ্য বিপণনে প্রায় ৩৩ হাজার দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি ফ্যাশন ডিজাইন, মার্চেন্ডাইজিং, টেক্সটাইল, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, প্রোডাকশন ও কমপ্লায়েন্সসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে এখন থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, বিদেশি জনবলের ওপর নির্ভর করে কোনো শিল্প টেকসই হতে পারে না।

আমির হোসেন আমু বলেন, দেশেই যোগ্য ও দক্ষ জনবল তৈরি করা হলে, এ খাতে কর্মরত দেশি জনবলের জায়গায় দেশীয় জনশক্তির পরিবর্তন ঘটবে। এতে করে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে অধিক দক্ষতা সম্পন্ন জনবল বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। ফলে আমাদেরর রেমিট্যান্সের পরিমাণও বাড়বে। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টায় কাজ চলছে।

তিনি বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো প্রশিক্ষিত এসএমই ফ্যাশন ডিজাইনারদের প্রস্তুতকৃত পোশাক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতের গুণগত মানোন্নয়ন ও মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। পাশাপাশি এসএমই পোশাক ডিজাইনারদের সাথে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ ও পোশাক বিক্রেতাদের কার্যকর ব্যবসায়িক লিংকেজ স্থাপনেও এ প্রদর্শনীর ভূমিকা হবে অনন্য।

মন্ত্রী আরো বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান এসএমই ফাউন্ডেশন এসএমই পোশাক ডিজাইনারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। এতে করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি জনবলের ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। শুধু পোশাক ডিজাইনার নয়, সামগ্রিকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশন একটি নিবেদিত প্রতিষ্ঠান। এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পণ্য বৈচিত্রকরণ, তৈরি পোশাক বিপণন, অর্থায়ন ও ঋণ সুবিধা প্রদান, মার্কেট লিংকেজ তৈরি, পণ্যের মান নিয়ে গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এটি শুরু থেকে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে আসছে। ফলে ইতিমধ্যে দেশে একটি সুসংহত ও টেকসই এসএমই শিল্প খাত গড়ে উঠেছে। দক্ষ নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতেও এসএমই ফাউন্ডেশনের অবদান উল্লেখ করার মতো।

নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে তিনি বলেন, নারী ক্ষমতায়ন আমাদের সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গিকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে আমরা নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। নারীদের উন্নয়নের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন তৃণমূল পর্যায় থেকে নারী উদ্যোক্তা তৈরির ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশি অনেক নারী উদ্যোক্তা দেশে-বিদেশে পুরস্কৃত হয়ে এসএমই খাতকে সমৃদ্ধ করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ফ্যাশন ডিজাইন কোর্স আয়োজন ফাউন্ডেশনের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের অংশ। এ প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্কিং উইথ ফ্যাশন ডিজাইন’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ৬০০ জন ফ্যাশন ডিজাইনারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদার আলোকে হাল ফ্যাশনের পোশাক প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে। পোশাকসহ উৎপাদিত এসএমই পণ্যের মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেও এ প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের  ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন- শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুষেণ চন্দ্র দাস, ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আজহারুল হক আজাদ, বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার চন্দ্র শেখর সাহা, এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক এস এম শাহীন আনোয়ার প্রমুখ।

 

বাংলাবিজনিউজ/আনোয়ার